ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুবরাজ খুররমের ঢাকায় এক সপ্তাহ: শাহ জাহানের অজানা অধ্যায়

সম্রাট শাহ জাহান। ছবি: সংগৃহীত

মুঘল সম্রাট শাহ জাহান তাজমহল নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তবে অনেকেই জানেন না, সম্রাট হওয়ার বহু আগেই তিনি একবার ঢাকায় এক সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন যুবরাজ খুররম—সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র।

এই সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল রাজদরবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রভাবশালী স্ত্রী নূর জাহান রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং মনে করতেন, যুবরাজ খুররম সম্রাট হলে তিনি তার ক্ষমতা হারাবেন। ১৬২২ সালের এপ্রিলে তিনি তার মেয়ে ল্যাডলি বেগমকে জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ পুত্র শাহরিয়ারের সঙ্গে বিয়ে দেন, যাতে ভবিষ্যতে সম্রাটের পেছনে নিজের প্রভাব বজায় রাখা যায়।

এরপর, শাহ জাহানকে রাজনীতি থেকে দূরে সরাতে পারস্যের শাহ আব্বাসের বাহিনীর মোকাবিলায় তাকে কান্দাহারে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়। যুবরাজ এই ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে সেখানে যেতে অস্বীকার করেন—যা ছিল কার্যত বিদ্রোহ। তিনি দাক্ষিণাত্যে সৈন্য জড়ো করেন; কিন্তু পরাজয়ের মুখে পড়ে পূর্ব দিকে, বাংলার দিকে পালিয়ে আসেন। নদীবিধৌত বাংলা অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিদ্রোহীদের জন্য আদর্শ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।

১৬২৩ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তার ছোট বাহিনী নিয়ে উড়িষ্যায় প্রবেশ করেন। দিল্লির মুঘল দরবার তখনই ঢাকার সুবাদার ইব্রাহিম খানকে সতর্ক করে দেয় এবং উড়িষ্যার সুবাদার আহমদ বেগের ওপর নজরদারি বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু যুবরাজ যখন উড়িষ্যায় প্রবেশ করেন, আহমদ বেগ কোনো প্রতিরোধ করেননি। এরপর যুবরাজ বর্ধমানের দুর্গ দখল করেন এবং মুঘল প্রশাসনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেন।

সুবাদার ইব্রাহিম খান দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তিনি যশোর, ত্রিপুরা, ভোলা, সিলেট, ফুলডুবি ও কাছাড়ের গুরুত্বপূর্ণ ফাঁড়িগুলো সুরক্ষিত করেন। ঢাকার হেরেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি তার সহকারী ইদ্রিসকে ৫০০ অশ্বারোহী এবং ১০০০ গোলন্দাজসহ নিয়োগ দেন। যুবরাজ ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে পারেন এমন আশঙ্কায় ইব্রাহিম খান নিজে আকবরনগরের (বর্তমান রাজমহল) দিকে অগ্রসর হন তাকে ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করার জন্য। এটি ছিল মধ্যযুগীয় যুদ্ধকৌশলের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

১৬২৪ সালের শুরুতে যুবরাজ শাহ জাহান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে ইব্রাহিম খানকে পক্ষ ত্যাগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু জাহাঙ্গীরের প্রতি অনুগত সুবাদার তা প্রত্যাখ্যান করেন। যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

দুর্ভাগ্যবশত, ইব্রাহিম খান তার অভিজ্ঞ সৈন্যদের অন্যত্র মোতায়েন করে রেখেছিলেন। ফলে তিনি অনভিজ্ঞ বাহিনী নিয়ে যুদ্ধে নামেন এবং এক আফগান সৈনিকের হাতে নিহত হন—যিনি জানতেন না তিনি কাকে হত্যা করছেন। শাহ জাহানের বাহিনী বিজয় লাভ করে।

পরাজিত সুবাদারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে যুবরাজ শাহ জাহান নির্দেশ দেন, ইব্রাহিম খানের মস্তক প্রকাশ্যে প্রদর্শন না করা হোক এবং তার মরদেহ তার পুত্রের কবরে দাফন করা হোক।

জয়ের পর শাহ জাহান তার অনুগত সেনাপতিদের পুরস্কৃত করেন। রাজমহলের যুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দেওয়া দারাব খানকে ঢাকার দায়িত্ব দেন এবং তাকে বাড়তি সামরিক শক্তি প্রদান করেন।

এরপর যুবরাজ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রাজমহল প্রাসাদ রাজার প্রতিনিধি ভীমের তত্ত্বাবধানে অর্পণ করে তিনি পান্ডুয়ার শেখ নূর কুতুব আলমের মাজার জিয়ারত করেন এবং ঘোড়াঘাটে শিবির স্থাপন করেন। এরপর তিনি খাজা ইদ্রাককে ঢাকায় পাঠান স্থানীয় অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে। ছয় দিন পর শাহজাদপুরে শিবির স্থাপন করেন এবং তিন দিন পর ১৬২৪ সালের মে মাসে ঢাকায় প্রবেশ করেন।

খাজা ইদ্রাকের প্রচেষ্টা সফল হয়। ঢাকায় কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি। ইব্রাহিম খানের বিধবা স্ত্রী পাটনায় পালানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু যুবরাজের অগ্রগামী বাহিনী তাকে থামিয়ে দেয়। পরিস্থিতি বুঝে স্থানীয় কর্মকর্তারা এবং মুঘল আমলারা যুবরাজকে স্বাগত জানান। এমনকি প্রয়াত সুবাদারের বিধবা স্ত্রীও তাকে সশ্রদ্ধ অভ্যর্থনা জানান।

ঢাকায় অবস্থানকালে শাহ জাহান পুরান ঢাকার দুর্গে (বর্তমান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার) বসবাস শুরু করেন এবং বাংলার অঘোষিত শাসকের ভূমিকায় বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন: কোচবিহার ও কামরূপ) শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তার মূল লক্ষ্য ছিল দিল্লির সিংহাসনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা।

ইতোমধ্যে ইব্রাহিম খানের ভাতিজা আহমদ বেগ ৪৫ লাখ টাকা এবং ৫০০টি হাতি হস্তান্তর করেন। শাহ জাহান প্রয়াত সুবাদারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আরও ৪০ লাখ টাকা, রেশম, মুসাব্বার, অস্ত্র ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সংগ্রহ করেন।

ঢাকায় এক সপ্তাহ কাটিয়ে শাহ জাহান নদীপথে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং তার সেনাপতিরা যান স্থলপথে।

উপসংহার>
এই এক সপ্তাহের ঢাকাবাস ছিল কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং তা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অধ্যায়, যা যুবরাজ খুররমের সাম্রাজ্য দখলের পথে তাকে এক ধাপ এগিয়ে দেয়। ইতিহাসের এই বিস্মৃত অধ্যায় আমাদের প্রমাণ করে যে, শাহ জাহান কেবল প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীকই ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক কুশলী কূটনীতিক এবং দক্ষ যোদ্ধাও।

সর্বাধিক পঠিত

গুণগত মানে জোর, বাতিল নিম্নমানের চামড়া

যুবরাজ খুররমের ঢাকায় এক সপ্তাহ: শাহ জাহানের অজানা অধ্যায়

আপডেট সময়: ১০:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫

মুঘল সম্রাট শাহ জাহান তাজমহল নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তবে অনেকেই জানেন না, সম্রাট হওয়ার বহু আগেই তিনি একবার ঢাকায় এক সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন যুবরাজ খুররম—সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র।

এই সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল রাজদরবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রভাবশালী স্ত্রী নূর জাহান রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং মনে করতেন, যুবরাজ খুররম সম্রাট হলে তিনি তার ক্ষমতা হারাবেন। ১৬২২ সালের এপ্রিলে তিনি তার মেয়ে ল্যাডলি বেগমকে জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ পুত্র শাহরিয়ারের সঙ্গে বিয়ে দেন, যাতে ভবিষ্যতে সম্রাটের পেছনে নিজের প্রভাব বজায় রাখা যায়।

এরপর, শাহ জাহানকে রাজনীতি থেকে দূরে সরাতে পারস্যের শাহ আব্বাসের বাহিনীর মোকাবিলায় তাকে কান্দাহারে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়। যুবরাজ এই ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে সেখানে যেতে অস্বীকার করেন—যা ছিল কার্যত বিদ্রোহ। তিনি দাক্ষিণাত্যে সৈন্য জড়ো করেন; কিন্তু পরাজয়ের মুখে পড়ে পূর্ব দিকে, বাংলার দিকে পালিয়ে আসেন। নদীবিধৌত বাংলা অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিদ্রোহীদের জন্য আদর্শ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।

১৬২৩ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তার ছোট বাহিনী নিয়ে উড়িষ্যায় প্রবেশ করেন। দিল্লির মুঘল দরবার তখনই ঢাকার সুবাদার ইব্রাহিম খানকে সতর্ক করে দেয় এবং উড়িষ্যার সুবাদার আহমদ বেগের ওপর নজরদারি বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু যুবরাজ যখন উড়িষ্যায় প্রবেশ করেন, আহমদ বেগ কোনো প্রতিরোধ করেননি। এরপর যুবরাজ বর্ধমানের দুর্গ দখল করেন এবং মুঘল প্রশাসনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেন।

সুবাদার ইব্রাহিম খান দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তিনি যশোর, ত্রিপুরা, ভোলা, সিলেট, ফুলডুবি ও কাছাড়ের গুরুত্বপূর্ণ ফাঁড়িগুলো সুরক্ষিত করেন। ঢাকার হেরেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি তার সহকারী ইদ্রিসকে ৫০০ অশ্বারোহী এবং ১০০০ গোলন্দাজসহ নিয়োগ দেন। যুবরাজ ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে পারেন এমন আশঙ্কায় ইব্রাহিম খান নিজে আকবরনগরের (বর্তমান রাজমহল) দিকে অগ্রসর হন তাকে ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করার জন্য। এটি ছিল মধ্যযুগীয় যুদ্ধকৌশলের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

১৬২৪ সালের শুরুতে যুবরাজ শাহ জাহান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে ইব্রাহিম খানকে পক্ষ ত্যাগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু জাহাঙ্গীরের প্রতি অনুগত সুবাদার তা প্রত্যাখ্যান করেন। যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

দুর্ভাগ্যবশত, ইব্রাহিম খান তার অভিজ্ঞ সৈন্যদের অন্যত্র মোতায়েন করে রেখেছিলেন। ফলে তিনি অনভিজ্ঞ বাহিনী নিয়ে যুদ্ধে নামেন এবং এক আফগান সৈনিকের হাতে নিহত হন—যিনি জানতেন না তিনি কাকে হত্যা করছেন। শাহ জাহানের বাহিনী বিজয় লাভ করে।

পরাজিত সুবাদারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে যুবরাজ শাহ জাহান নির্দেশ দেন, ইব্রাহিম খানের মস্তক প্রকাশ্যে প্রদর্শন না করা হোক এবং তার মরদেহ তার পুত্রের কবরে দাফন করা হোক।

জয়ের পর শাহ জাহান তার অনুগত সেনাপতিদের পুরস্কৃত করেন। রাজমহলের যুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দেওয়া দারাব খানকে ঢাকার দায়িত্ব দেন এবং তাকে বাড়তি সামরিক শক্তি প্রদান করেন।

এরপর যুবরাজ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রাজমহল প্রাসাদ রাজার প্রতিনিধি ভীমের তত্ত্বাবধানে অর্পণ করে তিনি পান্ডুয়ার শেখ নূর কুতুব আলমের মাজার জিয়ারত করেন এবং ঘোড়াঘাটে শিবির স্থাপন করেন। এরপর তিনি খাজা ইদ্রাককে ঢাকায় পাঠান স্থানীয় অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে। ছয় দিন পর শাহজাদপুরে শিবির স্থাপন করেন এবং তিন দিন পর ১৬২৪ সালের মে মাসে ঢাকায় প্রবেশ করেন।

খাজা ইদ্রাকের প্রচেষ্টা সফল হয়। ঢাকায় কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি। ইব্রাহিম খানের বিধবা স্ত্রী পাটনায় পালানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু যুবরাজের অগ্রগামী বাহিনী তাকে থামিয়ে দেয়। পরিস্থিতি বুঝে স্থানীয় কর্মকর্তারা এবং মুঘল আমলারা যুবরাজকে স্বাগত জানান। এমনকি প্রয়াত সুবাদারের বিধবা স্ত্রীও তাকে সশ্রদ্ধ অভ্যর্থনা জানান।

ঢাকায় অবস্থানকালে শাহ জাহান পুরান ঢাকার দুর্গে (বর্তমান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার) বসবাস শুরু করেন এবং বাংলার অঘোষিত শাসকের ভূমিকায় বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন: কোচবিহার ও কামরূপ) শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তার মূল লক্ষ্য ছিল দিল্লির সিংহাসনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা।

ইতোমধ্যে ইব্রাহিম খানের ভাতিজা আহমদ বেগ ৪৫ লাখ টাকা এবং ৫০০টি হাতি হস্তান্তর করেন। শাহ জাহান প্রয়াত সুবাদারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আরও ৪০ লাখ টাকা, রেশম, মুসাব্বার, অস্ত্র ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সংগ্রহ করেন।

ঢাকায় এক সপ্তাহ কাটিয়ে শাহ জাহান নদীপথে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং তার সেনাপতিরা যান স্থলপথে।

উপসংহার>
এই এক সপ্তাহের ঢাকাবাস ছিল কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং তা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অধ্যায়, যা যুবরাজ খুররমের সাম্রাজ্য দখলের পথে তাকে এক ধাপ এগিয়ে দেয়। ইতিহাসের এই বিস্মৃত অধ্যায় আমাদের প্রমাণ করে যে, শাহ জাহান কেবল প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীকই ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক কুশলী কূটনীতিক এবং দক্ষ যোদ্ধাও।