পবিত্র ঈদুল আজহার দিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডমেস্টিক ট্রানজিট (টিপি) লাউঞ্জে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশি-বিদেশি যাত্রীরা। ট্রানজিট লাউঞ্জের একমাত্র ক্যান্টিনটি কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বন্ধ থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার ও পানীয় ছাড়াই অপেক্ষা করতে হয়েছে শত শত যাত্রীকে। এতে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীরা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শেষে ডমেস্টিক কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার জন্য ট্রানজিট লাউঞ্জে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু সেখানে খাবার, পানি কিংবা ন্যূনতম রিফ্রেশমেন্টের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের নিয়ে অনেক পরিবারকে দুর্ভোগে পড়তে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ডমেস্টিক টার্মিনালের ভেতরে থাকা ক্যান্টিনটি সাধারণত ২৪ ঘণ্টাই চালু থাকে। এমনকি আগের ঈদগুলোতেও এটি খোলা ছিল। তবে এবার কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ক্যান্টিন বন্ধ থাকায় যাত্রীরা হঠাৎ করেই বিপাকে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ে দায়িত্বরত কর্মীদের সঙ্গে কয়েক দফা বাকবিতণ্ডা ও উত্তেজনার ঘটনাও ঘটে।
সৌদি আরব থেকে আসা যাত্রী আবু বকর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নেই, ভেতরে খাবার নেই, পানি নেই। ছোট বাচ্চা আর বৃদ্ধ মানুষ নিয়ে আমরা চরম কষ্টে আছি। এটা আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরের চিত্র হতে পারে না।”
শুধু আন্তর্জাতিক ট্রানজিট যাত্রীরাই নন, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রীরাও একই সংকটে পড়েছেন বলে জানা গেছে। ঈদের দিন সকালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে আসা যাত্রীরা খাবার ও পানির অভাবে দুর্ভোগে পড়েন।
ঢাকা থেকে যশোরগামী ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রী মোহাম্মদ হানিফ বলেন,
“সকালে ফ্লাইট ছিল। ঈদের দিন হওয়ায় বাইরে কোথাও রেস্টুরেন্ট খোলা পাইনি। ভেবেছিলাম বিমানবন্দরে এসে অন্তত নাস্তা আর পানি পাওয়া যাবে। কিন্তু এখানে এসে দেখি লাউঞ্জের রেস্টুরেন্টেও তালা ঝুলছে। অথচ বিমানবন্দর তো ২৪ ঘণ্টা যাত্রীসেবা দেওয়ার কথা।”
অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, ঈদের ছুটির কারণে বিমানবন্দরের বাইরের অধিকাংশ দোকানপাট ও রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকলেও ভেতরে যাত্রীসেবার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “ঈদ বা সরকারি ছুটির দিনেও বিমানবন্দর হচ্ছে ২৪ ঘণ্টার সেবা খাত। এখানে যাত্রীসেবা বন্ধ হওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ট্রানজিট যাত্রীরা কার্যত বিমানবন্দরের ভেতরেই আটকে থাকেন। তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না রাখা বড় ধরনের ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা।”
তিনি আরও বলেন, “বিদেশফেরত যাত্রীরা বিমানবন্দর থেকেই একটি দেশের সেবার মান বিচার করেন। এ ধরনের ঘটনা দেশের বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে।”
বিদেশফেরত আরেক যাত্রী ইউসুফ আমিন বলেন, “বিদেশ থেকে এসে কয়েক ঘণ্টা ধরে বসে আছি। অথচ একটা পানির বোতল কেনারও সুযোগ নেই। ঈদের দিন বলে কি যাত্রীসেবা বন্ধ থাকবে?”
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদের ছুটিতেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক যাত্রীর চাপ থাকে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা বহু যাত্রী ডমেস্টিক কানেক্টিং ফ্লাইট ব্যবহার করেন। এমন পরিস্থিতিতে ট্রানজিট লাউঞ্জের একমাত্র খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
এদিকে ডোমেস্টিক টার্মিনালের ক্যান্টিনটি কেন বন্ধ ছিল এবং যাত্রীদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল কিনা—এ বিষয়ে জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগিব সামাদ বলেন,
“এটা মূলত যারা ক্যান্টিন পরিচালনা করে তারাই বলতে পারবেন। আমাদের পক্ষ থেকে তাদের বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এমনকি তারা বন্ধ রেখেছে কিনা, সেটাও আমার জানা নেই।”
যাত্রীদের দাবি, আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে ঈদের মতো ব্যস্ত সময়েও ন্যূনতম খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় দেশের প্রধান বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

অনলাইন ডেস্ক 
