সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে ঈদুল আজহার প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, বাছাই ও সংরক্ষণের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। সকাল থেকে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকভর্তি কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করে শিল্পনগরীতে। তবে এবার ত্রুটিযুক্ত, পচনধরা ও রোগাক্রান্ত পশুর চামড়া সংগ্রহে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্যানারিগুলো। ফলে ইতোমধ্যে আসা চামড়ার প্রায় ২০ শতাংশ বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুর পর্যন্ত সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে প্রায় ১১ হাজার কাঁচা চামড়া পৌঁছেছে। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিল্পনগরীর বিভিন্ন ট্যানারিতে বাড়তে থাকে চামড়াবাহী ট্রাকের ভিড়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। ঈদের প্রথম দিন হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ী, আড়তদার ও সংগ্রহকারীরা দ্রুত চামড়া নিয়ে শিল্পনগরীতে আসতে শুরু করেছেন।
সরেজমিনে শিল্পনগরীর বিভিন্ন ট্যানারি ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি কারখানাতেই চলছে চরম ব্যস্ততা। কোথাও ট্রাক থেকে দ্রুত চামড়া নামানো হচ্ছে, কোথাও আবার শ্রমিকরা লবণ দিয়ে সংরক্ষণের কাজ করছেন। চামড়ার গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখতে শ্রমিকদের নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে দেখা গেছে। দুর্গন্ধ ও প্রতিকূল পরিবেশ উপেক্ষা করেই দিন-রাত এক করে দায়িত্ব পালন করছেন তারা।
ট্যানারি মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের প্রথম দিন থেকেই চামড়া সংগ্রহ শুরু হলেও মানহীন চামড়া কেনার বিষয়ে ট্যানারিগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে চর্মরোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া, ছিদ্রযুক্ত, অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত বা সংরক্ষণে অবহেলার কারণে পচনধরা চামড়া গ্রহণ করা হচ্ছে না। কারণ এসব চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের।
একটি ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরিকুল ইসলাম খান বলেন, “চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য রাতভর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলবে। তবে আমরা ত্রুটিপূর্ণ ও রোগাক্রান্ত চামড়া নিচ্ছি না। দুপুর পর্যন্ত যেসব চামড়া এসেছে, তার প্রায় ২০ শতাংশই বাতিল করতে হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “চামড়ার গুণগত মান রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ভালো মানের চামড়া সংগ্রহ করতে না পারলে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
সংশ্লিষ্টরা জানান, নিজস্ব সংগ্রহ টিমের পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেও চামড়া সংগ্রহ করা হচ্ছে। শিল্পনগরীতে পর্যাপ্ত লবণ মজুত রাখা হয়েছে যাতে দ্রুত চামড়া সংরক্ষণ করা যায়। এছাড়া অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাতে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ চামড়া প্রাথমিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই কাঁচা চামড়ার সঠিক মূল্য না পাওয়া, সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে দেশের চামড়া খাত নানা সংকটের মুখোমুখি। তবে এবার সরকার আগেভাগেই দাম নির্ধারণ এবং সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির কারণে পরিস্থিতি কিছুটা ইতিবাচক হতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
এদিকে সরকার এ বছর কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কিছুটা বাড়িয়ে নির্ধারণ করেছে। ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। ঢাকার বাইরে এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। এছাড়া খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন করা গেলে এবং চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে তারা কিছুটা লাভবান হতে পারবেন। একইসঙ্গে এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলোও চামড়া বিক্রি করে ভালো অর্থ পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে দেশের চামড়া শিল্প আবারও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাতে পরিণত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সরকারি তদারকি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা।

বাংলাদেশ খবর ডেস্ক 
