ঢাকা , শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি আজ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর: ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের গৌরবগাথা

৫ আগস্ট, ২০২৫ — আজ রক্তে রঞ্জিত এক বিপ্লবের বর্ষপূর্তি। এক বছর আগে ঠিক এই দিনে, ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল জনতার গণ-অভ্যুত্থান। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়—এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনার দিন। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এই দিনে জাতি স্মরণ করছে তাদের অমর সন্তানদের, যাঁরা জীবন দিয়ে দেশের গণতন্ত্রের মশাল প্রজ্বালন করেছেন।

গত বছরের এই দিনে, ৫ আগস্ট, ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা জনরোষের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান—এমনটাই বলছেন সেই আন্দোলনের কর্মীরা। এই ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় গণজাগরণের রূপ নেয়, যা পরবর্তীতে “চব্বিশের বর্ষা বিপ্লব” নামে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। এই বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সাহসী বিপ্লবী আবু সাঈদ, যিনি হুডখোলা বুকে দুহাত প্রসারিত করে শহীদ হন জনতার সামনে। তাঁর আত্মবলিদান আজো জাতিকে সাহস জোগায়।

এই বিপ্লবে প্রায় দেড় হাজার বিপ্লবী প্রাণ দেন, আহত হন হাজার হাজার মানুষ। কেউ কেউ হারান চিরতরের দৃষ্টিশক্তি, কেউবা পঙ্গুত্ব বরণ করেন—তবুও মুখে হাসি রেখে। স্কুলপড়ুয়া কিশোর আনাসের মাকে লেখা বিদায়ী চিঠি, যে শহীদের কাফেলায় নাম লিখিয়ে আর ফিরে আসেনি, এখনও মানুষের হৃদয়ে বিদ্যুৎ বয়ে আনে।

গেল এক বছরে অনেক আশা-ভরসা, অনেক হতাশা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে জাতিকে। মানুষ আজ প্রশ্ন তোলে—ফ্যাসিবাদ থেকে আদৌ কি মুক্তি মিলেছে? একসময় যারা একতাবদ্ধ হয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, তারা কি আজ আবার ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় মুখোমুখি? এই বিভক্তি কি ‘কমন শত্রু’—আওয়ামী স্বৈরতন্ত্রকে ভুলিয়ে দিয়েছে?

বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই প্রশ্নগুলো কঠিন হলেও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ, যারা শাহাদাত বরণ করে নতুন ইতিহাস লিখেছেন, তারা সবাই আশা করেছিলেন একটি শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের। সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হলে আত্মসমালোচনার সাহস দেখাতে হবে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

তবুও, হতাশার ছায়ার মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। নতুন প্রজন্ম দেশত্যাগের চিন্তা নয়, বরং দেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর। তারা চায় ভোটাধিকার, চায় মানুষের শাসনে পরিচালিত একটি আইনি রাষ্ট্রব্যবস্থা।

জনগণ এখন সচেতন—তারা জানে কীভাবে শোষকের বিরুদ্ধে কথা বলতে হয়, কীভাবে রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে হয়। আর এটাই বর্ষা বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অর্জন।

এক বছরের এই পথচলায় যদিও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে, অনেক কিছু পাওয়ার অপেক্ষায়, তবুও একবিংশ শতকের এই সাহসী অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের মানুষ কখনো স্বৈরতন্ত্র মেনে নেয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে প্রয়োজন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই পারে এই বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে। একমাত্র তা-ই নিশ্চিত করতে পারে গণতন্ত্র, ভোট ও ভাতের অধিকার।

আজকের দিনটি তাই শুধু স্মরণ নয়, অঙ্গীকারেরও দিন—যেখানে স্বৈরাচার নয়, জয় হোক জনগণের, জয় হোক মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার।

সর্বাধিক পঠিত

গুণগত মানে জোর, বাতিল নিম্নমানের চামড়া

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি আজ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর: ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের গৌরবগাথা

আপডেট সময়: ১২:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫

৫ আগস্ট, ২০২৫ — আজ রক্তে রঞ্জিত এক বিপ্লবের বর্ষপূর্তি। এক বছর আগে ঠিক এই দিনে, ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল জনতার গণ-অভ্যুত্থান। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়—এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনার দিন। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এই দিনে জাতি স্মরণ করছে তাদের অমর সন্তানদের, যাঁরা জীবন দিয়ে দেশের গণতন্ত্রের মশাল প্রজ্বালন করেছেন।

গত বছরের এই দিনে, ৫ আগস্ট, ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা জনরোষের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান—এমনটাই বলছেন সেই আন্দোলনের কর্মীরা। এই ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় গণজাগরণের রূপ নেয়, যা পরবর্তীতে “চব্বিশের বর্ষা বিপ্লব” নামে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। এই বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সাহসী বিপ্লবী আবু সাঈদ, যিনি হুডখোলা বুকে দুহাত প্রসারিত করে শহীদ হন জনতার সামনে। তাঁর আত্মবলিদান আজো জাতিকে সাহস জোগায়।

এই বিপ্লবে প্রায় দেড় হাজার বিপ্লবী প্রাণ দেন, আহত হন হাজার হাজার মানুষ। কেউ কেউ হারান চিরতরের দৃষ্টিশক্তি, কেউবা পঙ্গুত্ব বরণ করেন—তবুও মুখে হাসি রেখে। স্কুলপড়ুয়া কিশোর আনাসের মাকে লেখা বিদায়ী চিঠি, যে শহীদের কাফেলায় নাম লিখিয়ে আর ফিরে আসেনি, এখনও মানুষের হৃদয়ে বিদ্যুৎ বয়ে আনে।

গেল এক বছরে অনেক আশা-ভরসা, অনেক হতাশা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে জাতিকে। মানুষ আজ প্রশ্ন তোলে—ফ্যাসিবাদ থেকে আদৌ কি মুক্তি মিলেছে? একসময় যারা একতাবদ্ধ হয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, তারা কি আজ আবার ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় মুখোমুখি? এই বিভক্তি কি ‘কমন শত্রু’—আওয়ামী স্বৈরতন্ত্রকে ভুলিয়ে দিয়েছে?

বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই প্রশ্নগুলো কঠিন হলেও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ, যারা শাহাদাত বরণ করে নতুন ইতিহাস লিখেছেন, তারা সবাই আশা করেছিলেন একটি শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের। সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হলে আত্মসমালোচনার সাহস দেখাতে হবে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

তবুও, হতাশার ছায়ার মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। নতুন প্রজন্ম দেশত্যাগের চিন্তা নয়, বরং দেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর। তারা চায় ভোটাধিকার, চায় মানুষের শাসনে পরিচালিত একটি আইনি রাষ্ট্রব্যবস্থা।

জনগণ এখন সচেতন—তারা জানে কীভাবে শোষকের বিরুদ্ধে কথা বলতে হয়, কীভাবে রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে হয়। আর এটাই বর্ষা বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অর্জন।

এক বছরের এই পথচলায় যদিও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে, অনেক কিছু পাওয়ার অপেক্ষায়, তবুও একবিংশ শতকের এই সাহসী অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের মানুষ কখনো স্বৈরতন্ত্র মেনে নেয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে প্রয়োজন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই পারে এই বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে। একমাত্র তা-ই নিশ্চিত করতে পারে গণতন্ত্র, ভোট ও ভাতের অধিকার।

আজকের দিনটি তাই শুধু স্মরণ নয়, অঙ্গীকারেরও দিন—যেখানে স্বৈরাচার নয়, জয় হোক জনগণের, জয় হোক মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার।