বাংলাদেশকে বিনিয়োগের অন্যতম সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ এখন ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং চীনের সঙ্গে আরও গভীর শিল্প ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী। তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে তাদের ভ্যালু চেইন সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুই দেশের সহযোগিতা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্টহাউস হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ শীর্ষক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত এ সম্মেলনে চীনের বিভিন্ন খাতের প্রায় ১২৫ জন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার সম্পর্কিত কার্যপ্রণালি আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একটি ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং একটি টেকসই ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্বচ্ছ, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশ এ অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হবে। সেই লক্ষ্যেই সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলছে। এসব অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা, আধুনিক অবকাঠামো, বন্দর সংযোগ, দক্ষ মানবসম্পদ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ইকোসিস্টেম নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, “আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষায়িত শিল্প অবতরণ কেন্দ্র গড়ে তুলছি। এসব অঞ্চল শুধু শিল্প স্থাপনের জায়গা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রদান করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও মুনাফা নিশ্চিত করবে।”
চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আরও নিবিড় যোগাযোগ ও সেবা নিশ্চিত করতে শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালু করা হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী চীনা কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য, পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়ার জন্য এই কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও গতিশীল হবে।”
চীনা কোম্পানিগুলোর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা আপনাদের বাংলাদেশে ভ্যালু চেইন সম্প্রসারণের জন্য আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বাংলাদেশ শুধু বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মই নয়, বরং দ্রুত বর্ধনশীল একটি বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারও।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ ও দক্ষ কর্মশক্তি, প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয় এবং উন্নয়নশীল অবকাঠামো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান বিনিয়োগ চুক্তিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমরা চীনের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তিকে আরও উন্নত করতে কাজ করছি, যাতে বিনিয়োগকারীরা অধিক আস্থা, স্পষ্ট সুরক্ষা এবং একটি আধুনিক বিনিয়োগ কাঠামোর সুবিধা পান।”
তিনি উল্লেখ করেন, বিডায় ইতোমধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষায়িত রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট ডেস্ক চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি চীনা ভাষাভিত্তিক একটি বিশেষ ওয়েবসাইটও চালু করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ, সরকারি প্রণোদনা এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহজে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
সম্মেলনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, শিল্পখাতের সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুবিধা এবং সরকারি প্রণোদনা নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
তিনি বাংলাদেশের উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেন এবং চীনা উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আসুন, এই ফোরাম থেকে আমরা একটি অভিন্ন সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাই। এ অঞ্চলের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায় রচনা করি।”
তিনি বলেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতায় রূপান্তরিত করার এখনই উপযুক্ত সময়।
‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা।
এই সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ খবর ডেস্ক 














