মানুষের জীবনে চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। কেউ চায় জীবিকার প্রশস্ততা, কেউ সুস্বাস্থ্য, কেউ সফলতা, সম্মান কিংবা সুখী পারিবারিক জীবন। এসব প্রত্যাশা মানবজীবনের স্বাভাবিক অংশ। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এমন একটি মহামূল্যবান সম্পদ রয়েছে, যা অর্জিত হলে দুনিয়া ও আখিরাতের সব কল্যাণের দরজা খুলে যায়। সেই সম্পদ হলো মহান আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। কারণ আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট হন, তার জীবন বরকতময় হয়ে ওঠে, আমল কবুল হয় এবং আখিরাতে তার জন্য নির্ধারিত হয় চিরস্থায়ী সফলতা ও জান্নাতের সুসংবাদ।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের বিভিন্ন উপায় এবং এ সম্পর্কিত বহু দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষভাবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মতকে এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যার মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর ভালোবাসা, আল্লাহপ্রেমিকদের ভালোবাসা এবং এমন আমলের তাওফিক প্রার্থনা করতে পারেন, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়তা করে।
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত যে দোয়া করতেন, তা হলো—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ حُبَّكَ، وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَالْعَمَلَ الَّذِي يُبَلِّغُنِي حُبَّكَ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা হুব্বাকা, ওয়া হুব্বা মাই-ইউহিব্বুকা, ওয়াল-‘আমালাল্লাজি ইউবাল্লিগুনি হুব্বাকা।
অর্থ:
“হে আল্লাহ! আমি আপনার ভালোবাসা চাই, যারা আপনাকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা চাই এবং এমন কাজের তাওফিক চাই, যা আমাকে আপনার ভালোবাসার কাছে পৌঁছে দেয়।”
— (জামে তিরমিজি: ৩২৩৫)
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই সংক্ষিপ্ত দোয়ার মধ্যেই একজন মুমিনের আত্মিক উন্নতির মৌলিক তিনটি বিষয় একত্রিত হয়েছে— আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, নেককার মানুষের সাহচর্য এবং সৎ আমলের প্রতি আগ্রহ।
পবিত্র কুরআনের আলোকে আল্লাহ কাদের ভালোবাসেন?
মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। এসব গুণ অর্জনের মাধ্যমেই একজন বান্দা আল্লাহর প্রিয় হতে পারেন।
১. মুত্তাকি বা তাকওয়াবান ব্যক্তিরা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।”
— (সুরা আলে ইমরান: ৭৬)
তাকওয়া হলো আল্লাহভীতি ও তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। যারা গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করে চলেন, তারা আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসার অধিকারী হন।
২. সৎকর্মশীল ব্যক্তিরা
আল্লাহ বলেন—
إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।”
— (সুরা আল-বাকারা: ১৯৫)
মুহসিন বলতে তাদের বোঝানো হয়, যারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করেন।
৩. ধৈর্যশীল ব্যক্তিরা
পবিত্র কুরআনে এসেছে—
وَاللّٰهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ
অর্থ: “আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।”
— (সুরা আলে ইমরান: ১৪৬)
জীবনের বিপদ-আপদ, কষ্ট, দুঃখ ও পরীক্ষার মুহূর্তে যারা ধৈর্য ধারণ করেন, আল্লাহ তাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেন।
৪. ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।”
— (সুরা আল-মায়েদা: ৪২)
ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।
৫. তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীরা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।”
— (সুরা আল-বাকারা: ২২২)
ভুল ও গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং শারীরিক ও আত্মিক পবিত্রতা রক্ষা করা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহর ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ কী?
অনেকেই মনে করেন, আল্লাহকে ভালোবাসা কেবল আবেগ বা অনুভূতির বিষয়। কিন্তু ইসলাম শেখায়, প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ পায় আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
অর্থ: “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ কর; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”
— (সুরা আলে ইমরান: ৩১)
তাফসিরবিদদের মতে, এই আয়াতকে ‘আয়াতুল মাহাব্বাহ’ বা ভালোবাসার আয়াত বলা হয়। কারণ এখানে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের সহজ ও কার্যকর পথ হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে অর্জন করা যায় আল্লাহর ভালোবাসা
ইসলামি শিক্ষায় আল্লাহর ভালোবাসা লাভের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আমলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
পবিত্র কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করা।
নফল ইবাদত ও অতিরিক্ত আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া।
বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষকে ভালোবাসা।
গোপনে নেক আমল করা।
নিয়মিত দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা প্রার্থনা করা।
আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন সেই ভালোবাসার ঘোষণা আসমানবাসীদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا نَادَى جِبْرِيلَ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ
অর্থ: “যখন আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরিল (আ.)-কে ডেকে বলেন, ‘আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, তুমিও তাকে ভালোবাসো।’ এরপর আসমানবাসীদের মধ্যেও তার ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পৃথিবীতেও তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করা হয়।”
— (সহিহ বুখারি: ৩২০৯, সহিহ মুসলিম: ২৬৩৭)
দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোচ্চ সফলতা
বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, মানুষ জীবনে অসংখ্য প্রয়োজন ও চাহিদার জন্য দোয়া করে থাকে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়াগুলোর একটি হলো আল্লাহর ভালোবাসা লাভের দোয়া। কারণ আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হলে মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আসে, ইবাদতে স্বাদ সৃষ্টি হয়, দুনিয়ার বিপদ-আপদ সহজ মনে হয় এবং আখিরাতের মুক্তির পথ সুগম হয়।
তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত নিয়মিত এই দোয়াটি পাঠ করা এবং নিজের জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করা সম্ভব হয়।
পরিশেষে মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে প্রার্থনা— তিনি যেন আমাদের সবাইকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, আমাদের আমল কবুল করেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করেন। (আমিন)।

ধর্ম ডেস্ক 










