ঢাকা , শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন, স্বৈরাচারের অবসান; রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বাণী, নানা আয়োজনে দিবস পালিত হচ্ছে

ইতিহাস বদলে দেওয়া ৫ আগস্ট: গণ-অভ্যুত্থান দিবস আজ

আজ ৫ আগস্ট, ইতিহাস বদলে দেওয়া গণ-অভ্যুত্থান দিবস। গত বছরের এই দিনে ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা টানা ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে।

সরকারিভাবে দিবসটিকে ‘গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। এছাড়াও আজ বিকাল ৫টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় “জুলাই ঘোষণাপত্র” পাঠ করবেন প্রধান উপদেষ্টা। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও দিবসটি ঘিরে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটে গত বছরের ১ জুলাই, কোটা সংস্কার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু অল্প সময়েই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া গুলি, গণগ্রেফতার এবং সরকারি দলের হামলা-সংঘর্ষে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনের মূল দাবি হয়ে ওঠে সরকারের পদত্যাগ। এরপর ৫ আগস্ট লাখো মানুষ কারফিউ ভেঙে গণভবনের দিকে অগ্রসর হলে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।

পরদিন, ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে জানানো হয় যে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তিন বাহিনীর প্রধান, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মাত্র ছয় মাস আগে, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ বিলুপ্ত করে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মোড় আনা হয়।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশজুড়ে নিপীড়ন, হত্যা ও দমনপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (OHCHR) ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনায় ১১৮ শিশুসহ প্রায় ১,৪০০ জনকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এতে শিশু নিহতের হার ছিল ১২–১৩ শতাংশ। আহত হন প্রায় ১২ হাজার মানুষ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

রাষ্ট্রপতির বাণী

দিবসটি উপলক্ষ্যে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস। বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলে ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ঐতিহাসিক এই অর্জনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আমি দেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদকে, যারা দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে গিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। এই গণ-অভ্যুত্থানে আহত, পঙ্গুত্ব বরণ করা ও দৃষ্টিশক্তি হারানো সব বীর জুলাই যোদ্ধার ত্যাগ ও অবদানকে আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও আহতদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, অপহরণ, ভোটাধিকার হরণসহ সব ধরনের অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম ও আপামর জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই বৈষম্যমূলক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করাই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য। একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন করে জুলাই-এর চেতনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র একটি ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই সংস্কারের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের আশাআকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে একটি ন্যায় ও সমতাভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ-আজকের এই দিনে এ আমার একান্ত প্রত্যাশা। আমি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে গৃহীত সব কর্মসূচির সাফল্য কামনা করি।’

প্রধান উপদেষ্টার বাণী

পৃথক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন আজ। এক বছর আগে এই দিনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পূর্ণতা পায়, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয় প্রিয় স্বদেশ। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ, যাদের যূথবদ্ধ আন্দোলনের ফসল আমাদের এই ঐতিহাসিক অর্জন, তাদের সবাইকে আমি এই দিনে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আজ আমি স্মরণ করছি সেই সব সাহসী তরুণ, শ্রমিক, দিনমজুর, পেশাজীবীদের, যারা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে শাহাদতবরণ করেছেন। আমি গণ-অভ্যুত্থানে শাহাদতবরণকারী সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি সব জুলাই যোদ্ধাকে যারা আহত হয়েছেন, চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন, হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। জাতি তাদের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

টানা ১৬ বছরের স্বৈরাচারী অপশাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিস্ফোরণ ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরে এ সব লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব খাতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। জুলাই গণহত্যার বিচার কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। জুলাই শহীদদের স্মৃতি রক্ষা ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে রাজনৈতিক ও নির্বাচনব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সব সংস্কারে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সাথে আলোচনা চলমান আছে। একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। জুলাই আমাদের নতুন করে আশার আলো-একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ আমাদের রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ এনে দিয়েছে তা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। পতিত স্বৈরাচার ও তার স্বার্থলোভী গোষ্ঠী এখনো দেশকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে। আসুন সবাই মিলে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের ঠাঁই হবে না।’

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি

এদিকে আওয়ামী ‘ফ্যাসিবাদ’ পতনের স্মারক হিসাবে আজ ও আগামীকাল দেশব্যাপী বিজয় র‌্যালি করবে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আজ দেশের সব থানা ও উপজেলায় এবং আগামীকাল সব জেলা ও মহানগরে র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসাবে আগামীকাল বেলা ২টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বিজয় র‌্যালি বের হবে।

আজ গণমিছিল করবে জামায়াতে ইসলামী। রাজধানীর মহাখালী কলেরা হাসপাতালের সামনে থেকে সকাল ১০টায় মিছিলপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। স্বৈরাচার পতন দিবস পালন করবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে দিনব্যাপী নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করবে দলটি। এতে রয়েছে সকাল ১০টায় গণসমাবেশ, দুপুর ১২টায় গণমিছিল ও আড়াইটায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান দিবসে বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাম গণতান্ত্রিক জোট সমাবেশ করবে।

সর্বাধিক পঠিত

গুণগত মানে জোর, বাতিল নিম্নমানের চামড়া

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন, স্বৈরাচারের অবসান; রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বাণী, নানা আয়োজনে দিবস পালিত হচ্ছে

ইতিহাস বদলে দেওয়া ৫ আগস্ট: গণ-অভ্যুত্থান দিবস আজ

আপডেট সময়: ০৬:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫

আজ ৫ আগস্ট, ইতিহাস বদলে দেওয়া গণ-অভ্যুত্থান দিবস। গত বছরের এই দিনে ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা টানা ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে।

সরকারিভাবে দিবসটিকে ‘গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। এছাড়াও আজ বিকাল ৫টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় “জুলাই ঘোষণাপত্র” পাঠ করবেন প্রধান উপদেষ্টা। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও দিবসটি ঘিরে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটে গত বছরের ১ জুলাই, কোটা সংস্কার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু অল্প সময়েই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া গুলি, গণগ্রেফতার এবং সরকারি দলের হামলা-সংঘর্ষে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনের মূল দাবি হয়ে ওঠে সরকারের পদত্যাগ। এরপর ৫ আগস্ট লাখো মানুষ কারফিউ ভেঙে গণভবনের দিকে অগ্রসর হলে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।

পরদিন, ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে জানানো হয় যে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তিন বাহিনীর প্রধান, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মাত্র ছয় মাস আগে, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ বিলুপ্ত করে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মোড় আনা হয়।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশজুড়ে নিপীড়ন, হত্যা ও দমনপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (OHCHR) ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনায় ১১৮ শিশুসহ প্রায় ১,৪০০ জনকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এতে শিশু নিহতের হার ছিল ১২–১৩ শতাংশ। আহত হন প্রায় ১২ হাজার মানুষ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

রাষ্ট্রপতির বাণী

দিবসটি উপলক্ষ্যে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস। বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলে ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ঐতিহাসিক এই অর্জনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আমি দেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদকে, যারা দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে গিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। এই গণ-অভ্যুত্থানে আহত, পঙ্গুত্ব বরণ করা ও দৃষ্টিশক্তি হারানো সব বীর জুলাই যোদ্ধার ত্যাগ ও অবদানকে আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও আহতদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, অপহরণ, ভোটাধিকার হরণসহ সব ধরনের অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম ও আপামর জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই বৈষম্যমূলক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করাই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য। একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন করে জুলাই-এর চেতনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র একটি ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই সংস্কারের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের আশাআকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে একটি ন্যায় ও সমতাভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ-আজকের এই দিনে এ আমার একান্ত প্রত্যাশা। আমি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে গৃহীত সব কর্মসূচির সাফল্য কামনা করি।’

প্রধান উপদেষ্টার বাণী

পৃথক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন আজ। এক বছর আগে এই দিনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পূর্ণতা পায়, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয় প্রিয় স্বদেশ। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ, যাদের যূথবদ্ধ আন্দোলনের ফসল আমাদের এই ঐতিহাসিক অর্জন, তাদের সবাইকে আমি এই দিনে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আজ আমি স্মরণ করছি সেই সব সাহসী তরুণ, শ্রমিক, দিনমজুর, পেশাজীবীদের, যারা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে শাহাদতবরণ করেছেন। আমি গণ-অভ্যুত্থানে শাহাদতবরণকারী সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি সব জুলাই যোদ্ধাকে যারা আহত হয়েছেন, চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন, হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। জাতি তাদের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

টানা ১৬ বছরের স্বৈরাচারী অপশাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিস্ফোরণ ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরে এ সব লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব খাতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। জুলাই গণহত্যার বিচার কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। জুলাই শহীদদের স্মৃতি রক্ষা ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে রাজনৈতিক ও নির্বাচনব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সব সংস্কারে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সাথে আলোচনা চলমান আছে। একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। জুলাই আমাদের নতুন করে আশার আলো-একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ আমাদের রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ এনে দিয়েছে তা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। পতিত স্বৈরাচার ও তার স্বার্থলোভী গোষ্ঠী এখনো দেশকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে। আসুন সবাই মিলে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের ঠাঁই হবে না।’

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি

এদিকে আওয়ামী ‘ফ্যাসিবাদ’ পতনের স্মারক হিসাবে আজ ও আগামীকাল দেশব্যাপী বিজয় র‌্যালি করবে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আজ দেশের সব থানা ও উপজেলায় এবং আগামীকাল সব জেলা ও মহানগরে র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসাবে আগামীকাল বেলা ২টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বিজয় র‌্যালি বের হবে।

আজ গণমিছিল করবে জামায়াতে ইসলামী। রাজধানীর মহাখালী কলেরা হাসপাতালের সামনে থেকে সকাল ১০টায় মিছিলপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। স্বৈরাচার পতন দিবস পালন করবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে দিনব্যাপী নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করবে দলটি। এতে রয়েছে সকাল ১০টায় গণসমাবেশ, দুপুর ১২টায় গণমিছিল ও আড়াইটায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান দিবসে বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাম গণতান্ত্রিক জোট সমাবেশ করবে।