পৃথিবীর ইতিহাস কি কেবল মানবজাতির ইতিহাস? ইসলামী ঐতিহ্য বলছে—না। মানুষের আগমনের বহু আগে এই পৃথিবীর বুকে বিচরণ করত আরেক সৃষ্টি—জিন জাতি। তারা ছিল স্বাধীন, শক্তিশালী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু সময়ের প্রবাহে আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরে গিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে হানাহানি, রক্তপাত ও সীমাহীন ফিতনা-ফাসাদে লিপ্ত হয়। সেই অস্থির সময়ের পরই শুরু হয় পৃথিবীর এক নতুন অধ্যায়—ফেরেশতাদের আগমন, কাবা গৃহের সূচনা এবং পরবর্তীতে মানবজাতির আবির্ভাব।
জিনদের অবাধ্যতা ও পৃথিবীতে পরিবর্তনের সূচনা
ইসলামী ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, পৃথিবীর স্থলভাগে দীর্ঘকাল জিন জাতির বসবাস ছিল। কিন্তু তারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে অন্যায়, রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়ে। তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে ফেরেশতারা তাদের পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করে পাহাড় ও সমুদ্রসংলগ্ন এলাকায় সীমাবদ্ধ করে দেন।
এরপর পৃথিবীর স্থলভাগে ফেরেশতাদের বিচরণ শুরু হয়। কিন্তু পৃথিবীতে অবস্থান করলেও তাদের হৃদয় পড়ে থাকত সপ্তম আকাশে—আল্লাহর পবিত্র ঘর বাইতুল মামুরে।
বাইতুল মামুর—আকাশের পবিত্র ঘর
বাইতুল মামুরকে বলা হয় ফেরেশতাদের ইবাদতের কেন্দ্র। প্রতিদিন সেখানে ৭০ হাজার ফেরেশতা তাওয়াফ করেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, একবার তাওয়াফের পর সেই ফেরেশতারা আর কখনো দ্বিতীয়বার সেখানে ফিরে আসার সুযোগ পান না।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মিরাজের রজনীতে এই পবিত্র ঘর প্রত্যক্ষ করেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি সেখানে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে বাইতুল মামুরের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“আমি সেখানে ইবরাহিম (আ.)-এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি বাইতুল মামুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছিলেন। প্রতিদিন সেখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন এবং তারা আর কখনো সেখানে ফিরে আসেন না।”
— সহিহ মুসলিম: ৩০০
পৃথিবীতে কাবা গৃহের সূচনা
ইসলামী ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, পৃথিবীতে অবস্থান করেও ফেরেশতাদের অন্তরে আল্লাহর ঘর তাওয়াফের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত ছিল। তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে বাইতুল মামুরের বরাবর পৃথিবীতে একটি পবিত্র ঘর নির্মাণ করা হয়। ফেরেশতারাই সর্বপ্রথম সেই ঘরের তাওয়াফ করেন।
পরবর্তীকালে এই ঘরই কাবা শরিফ নামে পরিচিত হয় বলে বহু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
মানবজাতি সৃষ্টির ঘোষণা
এরপর আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের উদ্দেশে ঘোষণা দিলেন,
“আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি (খলিফা) সৃষ্টি করব।”
জিনদের পূর্বের কর্মকাণ্ড স্মরণ করে ফেরেশতারা বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন,
“আপনি কি এমন এক জাতিকে সৃষ্টি করবেন, যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে?”
আল্লাহ তাআলা উত্তর দিলেন,
“আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।”
(সূরা আল-বাকারা: ৩০)
এই সংক্ষিপ্ত সংলাপেই লুকিয়ে রয়েছে মানবজাতির দায়িত্ব, মর্যাদা ও পরীক্ষার গভীর তাৎপর্য।
আদম (আ.) ও পৃথিবীতে প্রথম ইবাদত
আল্লাহ তাআলা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি পৃথিবীতে এসে কাবা গৃহ পুনর্নির্মাণ করেন এবং সর্বপ্রথম মানব হিসেবে এই ঘরের তাওয়াফ করেন।
আদম (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে ফেরেশতারা বলেন,
“হে আদম! আপনার হজ কবুল হোক। আমরা আপনার আগমনের দুই হাজার বছর পূর্ব থেকেই এই ঘরের হজ ও তাওয়াফ করে আসছি।”
এই বর্ণনা কাবা শরিফের প্রাচীন মর্যাদা ও ইবাদতের ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ইঙ্গিত বহন করে।
ইবরাহিম (আ.)-এর হাতে কাবার ভিত্তি পুনঃস্থাপন
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) কাবা শরিফের ভিত্তি পুনঃস্থাপন করেন এবং বিনম্র কণ্ঠে দোয়া করেন—
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই আমল কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
সেই থেকে কাবা শরিফ মুসলিম উম্মাহর ইবাদতের কেন্দ্র, কিবলা এবং ঐক্যের প্রতীক।
যুগে যুগে কাবার মর্যাদা অটুট
পৃথিবীতে বহু সভ্যতার উত্থান-পতন হয়েছে। শিরক, মূর্তিপূজা ও নানা ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিস্তার ঘটেছে। তবুও আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের মর্যাদা কখনো ম্লান হয়নি। আদম (আ.) থেকে শুরু করে ইবরাহিম (আ.), মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং আজ পর্যন্ত কোটি কোটি মুসলমান এই পবিত্র ঘরকে কেন্দ্র করেই আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে আসছেন।
আজও বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত থেকে মুসলমানরা কাবা শরিফের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন এবং সুযোগ পেলে হজ ও ওমরাহ পালনের মাধ্যমে তাওয়াফের সৌভাগ্য অর্জন করেন।
পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
এখানে উল্লেখিত সব ঘটনা সহিহ হাদিসে সরাসরি বর্ণিত নয়। এর একটি অংশ ইসলামী ইতিহাস, তাফসির, সাহাবায়ে কিরামের আছার এবং প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রন্থ থেকে সংকলিত। তাই এসব তথ্যকে ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত; সহিহ হাদিসের সমমর্যাদাসম্পন্ন দলিল হিসেবে নয়।
তথ্যসূত্র
- পবিত্র কুরআন
- সহিহ মুসলিম
- আখবারু মাক্কাহ — আহমাদ আল-আজরাকি (রহ.)
- দালাইলুন নবুওয়াহ — ইমাম বায়হাকি (রহ.)
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ — ইবনু কাসির (রহ.)

ধর্ম ও জীবন ডেস্ক 










