ভারতীয় বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত মুখ মহিমা মাকওয়ানা। টেলিভিশন, বলিউড, দক্ষিণী সিনেমা ও ওটিটি—সব ক্ষেত্রেই নিজের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে তিনি বর্তমানে দর্শকদের প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। তবে আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, অসংখ্য প্রত্যাখ্যান এবং এক মায়ের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের অদম্য চেষ্টা।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের নানা অজানা অধ্যায় তুলে ধরেছেন মহিমা। তিনি জানান, অভিনয় কখনোই তার ব্যক্তিগত স্বপ্ন ছিল না। পরিবারের আর্থিক সংকট এবং মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতেই ছোটবেলা থেকে অভিনয়ের জগতে পথচলা শুরু করেন।
মহিমার ভাষ্য অনুযায়ী, তার মা ছোটবেলায় অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু জীবনের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। একসময় অভাবের সংসারে মা তাকে বলেছিলেন, জীবনের শেষ হওয়ার আগে তিনি নিজের একটি বাড়ি দেখতে চান। মায়ের সেই কথাই মহিমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়।
শৈশবের দিনগুলো ছিল কঠিন। স্কুলের অর্ধেক সময় ক্লাস করে বাসে চেপে এক অডিশন থেকে আরেক অডিশনে ছুটে বেড়াতেন তিনি। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়েও কখনো হাল ছাড়েননি। কারণ প্রতিটি ব্যর্থতার পর তার পাশে দাঁড়াতেন মা।
তবে অভিনয়ের শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না। মাত্র ৯ বছর বয়সে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘বালিকা বধূ’-এর সেটে এক পরিচালকের কাছ থেকে অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হয়েছিল তাকে। অভিনয় জানেন না—এমন মন্তব্য অনেকের মনোবল ভেঙে দিতে পারত। কিন্তু মহিমা সেই অপমানকে নিজের শক্তিতে পরিণত করেন এবং আরও বেশি পরিশ্রম করার সিদ্ধান্ত নেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১২ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে জি টিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘সাপনে সুহানে লাড়কাপান কে’-এর প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ধারাবাহিকটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেললে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মহিমা।
অভিনয় থেকে পাওয়া প্রথম বড় সাফল্যের অর্থ দিয়েই মাত্র ১৪ বছর বয়সে মায়ের জন্য একটি বাড়ি এবং একটি গাড়ি কিনে দেন তিনি। মায়ের বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারাকে আজও জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন এই অভিনেত্রী।
টেলিভিশনে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও বড় পর্দায় জায়গা করে নেওয়ার লড়াই ছিল আরও কঠিন। বহুবার অডিশনে ব্যর্থ হয়েছেন, অসংখ্যবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। অনেকেই তাকে শুধুই ‘টিভির অভিনেত্রী’ হিসেবে দেখতেন। তবুও নিজের লক্ষ্যে অটল ছিলেন মহিমা।
অবশেষে ২০২১ সালে সালমান খানের অভিনীত ‘অন্তিম’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে তার। সিনেমাটি মুক্তির পর চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুনভাবে পরিচিতি পান তিনি।
মহিমা বলেন, ‘অন্তিম’ মুক্তির পর হঠাৎ করেই অনেক মানুষের আচরণ বদলে যায়। যারা আগে আমাকে গুরুত্ব দিত না, তারাই পরে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছে। কিন্তু তারা জানত না, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দশকেরও বেশি সময়ের নিরলস পরিশ্রম, প্রত্যাখ্যান আর আত্মত্যাগ।
অভিনয়জীবনের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় প্রথম বাড়ি কেনার প্রায় ১১ বছর পর মুম্বাইয়ে নিজের দ্বিতীয় এবং আরও বড় একটি বাড়ি কিনেছেন মহিমা। পাশাপাশি তেলুগু চলচ্চিত্র ও বিভিন্ন ওটিটি প্রজেক্টে অভিনয় করে তিনি নিজের ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়েও একাধিক কাজের মাধ্যমে দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করছেন এই অভিনেত্রী।
তবে জীবনের সব অর্জনের মাঝেও একটি শূন্যতা আজও তাকে কষ্ট দেয়। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে না পাওয়ার বেদনা তার হৃদয়ে রয়ে গেছে।
আবেগঘন কণ্ঠে মহিমা বলেন, বাবা পাশে থাকলে কেমন অনুভূতি হয়, তা তিনি কখনো জানার সুযোগ পাননি। বন্ধুদের বাবার সঙ্গে সময় কাটাতে দেখলে নিজের জীবনের সেই অভাব আরও বেশি অনুভব করেন। তবে সব কষ্ট ও প্রতিকূলতা জয় করে মাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পেরেছেন—এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠা মহিমা মাকওয়ানার এই যাত্রা আজ অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার গল্প। সাফল্য কখনো রাতারাতি আসে না—বরং প্রতিটি অর্জনের পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ সময়ের ত্যাগ, ধৈর্য এবং অবিরাম প্রচেষ্টা। মহিমার জীবন সেই বাস্তবতারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বিনোদন ডেস্ক: 









