আধুনিক জীবনযাত্রার অনিয়ম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে বর্তমানে উচ্চ কোলেস্টেরল একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন জটিল রোগের কারণ হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুললে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং একই সঙ্গে হৃদযন্ত্রও সুস্থ থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাঁটা এমন একটি সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর ব্যায়াম, যা প্রায় সব বয়সের মানুষই করতে পারেন। প্রতিদিনের নিয়মিত হাঁটা শরীরে উচ্চ-ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন (HDL) বা ‘ভালো কোলেস্টেরল’-এর মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে নিম্ন-ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন (LDL) বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হাঁটা কীভাবে কোলেস্টেরল কমায়?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাঁটার ফলে শরীরে এমন কিছু এনজাইম বা উৎসেচক সক্রিয় হয়, যা রক্তে জমে থাকা অস্বাস্থ্যকর চর্বি ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে। এর ফলে রক্তনালিতে চর্বি জমার ঝুঁকি কমে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা উন্নত হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোরে অবস্থিত জনস হপকিন্স সিকারন সেন্টার ফর দ্য প্রিভেনশন অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের পরিচালক, কার্ডিওলজিস্ট ও অধ্যাপক ড. রজার ব্লুমেন্থাল বলেন, ব্যায়ামের মাধ্যমে কোলেস্টেরল কমার সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি জানা না গেলেও এর ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে অ্যারোবিক ব্যায়াম ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে অত্যন্ত কার্যকর।
হৃদস্পন্দন বাড়লেই মিলবে উপকার
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথসেন্ট্রাল’-এর বরাত দিয়ে ড. ব্লুমেন্থাল বলেন, এমন যেকোনো শারীরিক কার্যক্রম যা হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, তা কোলেস্টেরল এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। আর হাঁটা হলো এমন একটি ব্যায়াম, যা খুব সহজেই দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত মাঝারি গতিতে হাঁটা উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি কমাতে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত দৌড়ানোর মতোই কার্যকর হতে পারে।

সপ্তাহে কতক্ষণ হাঁটা উচিত?
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে এবং খারাপ কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভব হলে এই সময় ২০০ মিনিটে উন্নীত করা আরও ভালো। অর্থাৎ সপ্তাহে পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে অথবা প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
তবে পুরো সময় একসঙ্গে হাঁটতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। চাইলে দিনে দুইবার ১০ থেকে ১৫ মিনিট করেও হাঁটা যেতে পারে। এতেও শরীরে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
নতুনদের জন্য সহজ পরামর্শ
যারা দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাদের জন্যও রয়েছে সুখবর। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটা দিয়েই শুরু করা যেতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ানো উচিত।
নিজের সুবিধাজনক সময় বেছে নিয়ে হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কর্মব্যস্ত দিনে কম সময় এবং ছুটির দিনে তুলনামূলক বেশি সময় হাঁটলেও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
গবেষণায় যা জানা গেছে
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যায়ামও শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় মানুষের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, একদিনের ব্যায়ামে কোলেস্টেরলের ওপর খুব বেশি প্রভাব না পড়লেও, টানা ১৮ সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে ১৬০ মিনিট অ্যারোবিক ব্যায়াম করলে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
ড. ব্লুমেন্থাল বলেন, শুরুতেই কেউ যদি সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হাঁটতে না পারেন, তবুও সমস্যা নেই। ধীরে ধীরে সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলেই দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং কোলেস্টেরলের মাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে।

হাঁটার গতি বাড়ালেও মিলবে বাড়তি সুবিধা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে দৌড়ানো বাধ্যতামূলক নয়। নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি কিছু সময় দ্রুত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুললে আরও বেশি উপকার পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ-তীব্রতার অ্যারোবিক ব্যায়াম খারাপ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে কার্যকর। এজন্য প্রথমে ঘণ্টায় প্রায় তিন মাইল গতিতে হাঁটার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে কিছু সেশনে ঘণ্টায় চার মাইল পর্যন্ত গতি বাড়ানো যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এ জন্য চার সপ্তাহের একটি ধাপে ধাপে কর্মসূচি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন দ্রুত হাঁটার অভ্যাস ধরে রাখলে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য আরও ভালো থাকে।
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, নতুন কোনো ব্যায়াম কর্মসূচি শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যাদের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারী খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার, ধূমপান বর্জন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
উপসংহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ হৃদযন্ত্র ও নিয়ন্ত্রিত কোলেস্টেরলের জন্য ব্যয়বহুল কোনো উপায় নয়, বরং প্রতিদিনের নিয়মিত হাঁটাই হতে পারে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর সমাধান। অল্প সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে হাঁটার সময় ও গতি বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
সূত্র: সামা টিভি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা।

স্বাস্থ্য ডেস্ক 











