অনেক রোগই হঠাৎ করে শরীরে বাসা বাঁধে না। দীর্ঘদিন ধরে নীরবে শরীরে পরিবর্তন ঘটতে থাকে, কিন্তু ব্যস্ত জীবনের কারণে বেশিরভাগ মানুষ সেই সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেন না। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও পরে অনেক রোগ জটিল আকার ধারণ করে। তাই নির্দিষ্ট বয়সের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভারের সমস্যা, থাইরয়েডের রোগ, ক্যানসারসহ নানা জটিল অসুখের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে এসব রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে সুস্থ থাকার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তুলনামূলক কম বয়সেই হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলজনিত সমস্যা এবং প্রস্টেটের রোগ দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত সমস্যা, জরায়ুমুখের ক্যানসার ও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিও বয়সের সঙ্গে বাড়তে থাকে। তাই বয়সভিত্তিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এখন সময়ের দাবি।
৩০ বছর পার হলেই যেসব পরীক্ষা জরুরি
৩০ বছর বয়সের পর থেকেই শরীরের নিয়মিত কিছু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফাস্টিং ব্লাড সুগার এবং এইচবিএ১সি (HbA1c) পরীক্ষা। এর মাধ্যমে ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস রয়েছে কি না তা সহজেই জানা যায়।
এ ছাড়া লিপিড প্রোফাইল বা কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো উচিত। এতে শরীরে ভালো ও খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা নির্ণয় করা যায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
একই সঙ্গে লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) ও কিডনি ফাংশন টেস্ট (KFT) করিয়ে রাখা ভালো। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যায়।
১৮ বছর থেকেই রক্তচাপ পরীক্ষা, ২১ বছরের পর নারীদের বিশেষ পরীক্ষা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৮ বছর বয়স পার হওয়ার পর প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। কারণ উচ্চ রক্তচাপকে “নীরব ঘাতক” বলা হয়। অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক কিংবা কিডনির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে নারীদের জন্য ২১ বছর বয়সের পর প্যাপ স্মিয়ার (Pap Smear) পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি তিন বছর অন্তর এই পরীক্ষা করালে জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
৪০ বছর পেরোলেই বাড়তি সতর্কতা
৪০ বছর বয়সের পর শরীরের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নিয়মিত করা প্রয়োজন।
এর মধ্যে অন্যতম হলো কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC)। এটি রক্তের একটি মৌলিক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণ, এমনকি লিউকেমিয়া ও লিম্ফোমার মতো রক্তের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণও শনাক্ত করা সম্ভব।
এ বয়সে থাইরয়েড প্যানেল টেস্ট করানোও জরুরি। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে, যা ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি, হৃদস্পন্দনের পরিবর্তনসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি করে।
চোখের সুস্থতার জন্য গ্লুকোমা পরীক্ষা করানো উচিত। এতে চোখের চাপ বৃদ্ধি, রেটিনার সমস্যা এবং দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করা যায়।
নারীদের জন্য ম্যামোগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
৪০ বছর বয়স পার হওয়ার পর নারীদের নিয়মিত ম্যামোগ্রাম পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ম্যামোগ্রাম হলো স্তনের বিশেষ ধরনের এক্স-রে পরীক্ষা, যার মাধ্যমে স্তনের ভেতরে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি, টিউমার কিংবা স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা যায়। চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক অবস্থায় স্তন ক্যানসার ধরা পড়লে সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
৬০ বছরের পর যেসব পরীক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন
৬০ বছর বয়সের পর শরীরে ক্যানসারসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই এই বয়সে বেসিক স্কিন ক্যানসার স্ক্রিনিং করানো উচিত। এতে মেলানোমাসহ ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
পুরুষদের জন্য পিএসএ (PSA) বা প্রস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন টেস্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রস্টেটের সমস্যা বা প্রস্টেট ক্যানসারের সম্ভাবনা আগেভাগেই ধরা পড়ে।
যাদের দীর্ঘদিন ধরে পেটের সমস্যা, রক্তপাত বা আইবিএস (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম) রয়েছে, তাদের কোলোনোস্কোপি করানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। এর মাধ্যমে খাদ্যনালি ও বৃহদান্ত্রে টিউমার বা ক্যানসারের উপস্থিতি নির্ণয় করা সম্ভব।
হৃদরোগের ঝুঁকি থাকলে যা করবেন
যাদের হৃদরোগ রয়েছে বা ঝুঁকি বেশি, তাদের নিয়মিত হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইসিজি (ECG), ইকোকার্ডিওগ্রাম, স্ট্রেস টেস্ট, করোনারি ক্যালসিয়াম স্কোরিং, করোনারি অ্যানজিওগ্রাম এবং প্রয়োজন হলে হার্টের এমআরআই করানো যেতে পারে।
সচেতনতাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি সুস্থ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক রোগের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ শুরুতে দেখা যায় না। তাই বয়সভিত্তিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালে রোগ দ্রুত শনাক্ত হয়, চিকিৎসা সহজ হয় এবং জীবনঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যায়।
সুস্থ থাকতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান ও মাদক থেকে বিরত থাকা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোই হতে পারে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি।

লাইফস্টাইল ডেস্ক 











