রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার রায় আজ ঘোষণা করা হবে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ মামলার রায় প্রদান করবেন। রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে নিহত শিশুর পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দেশবাসী।
রাষ্ট্রপক্ষের আশা, মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার-এর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জবানবন্দির ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করবেন। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছে।
যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের দিন নির্ধারণ
গত ৪ জুন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল আজকের দিনটি রায় ঘোষণার জন্য নির্ধারণ করেন। রাষ্ট্রপক্ষে আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু এবং আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্লাহ যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন।
শুনানি শেষে পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, “মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, জব্দকৃত আলামত এবং আসামিদের ভূমিকা বিচার করলে ট্রাইব্যুনাল স্বীয় বিবেচনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করবেন—এটাই রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা।”
আত্মপক্ষ সমর্থনে দায় স্বীকার করেন সোহেল
রায় ঘোষণার আগে গত ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানিতে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে অপর আসামি স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ ঘটনায় আদালতে দেওয়া সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যেভাবে ঘটেছিল মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড
মামলার অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, নিহত রামিসা আক্তার রাজধানীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৯ মে সকালে আসামি স্বপ্না আক্তার কৌশলে শিশুটিকে নিজের কক্ষে নিয়ে যান।
এদিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর সময় হলে তার মা মেয়েকে খুঁজতে শুরু করেন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান তিনি। এতে সন্দেহ হলে শিশুটির বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা আসামিদের কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকে তারা রামিসার খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পান। ঘটনাটি মুহূর্তেই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ করে এবং ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করে।
ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার সোহেল
ঘটনার পর প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে যান। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদ-এর আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
একই দিনে আদালত সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
দ্রুত তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম
ঘটনার পরদিন ২০ মে নিহত রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আসামি করা হয়।
তদন্ত শেষে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে, ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক-এর আদালতে দুই আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন।
একই দিনে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন চার্জশিট গ্রহণ করেন। পরে ১ জুন আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য
মামলার বিচারিক কার্যক্রমে চার্জশিটভুক্ত মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষীদের জবানবন্দি, ফরেনসিক প্রতিবেদন, জব্দকৃত আলামত এবং অন্যান্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে, উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ তাদের মক্কেলদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে খালাস প্রার্থনা করেছে।
রায়ের অপেক্ষায় পরিবার ও দেশবাসী
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে শিশুটির হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে। আজ ঘোষিত হতে যাওয়া রায়ের মাধ্যমে বহুল আলোচিত এই মামলার বিচারিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
নিহত রামিসার পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেছে, আদালতের রায়ের মাধ্যমে তারা তাদের সন্তানের হত্যার বিচার পেতে চান। এখন সবার নজর ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের রায়ের দিকে।

অনলাইন ডেস্ক 







