ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় হাইকোর্ট বিভাগের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিরুদ্ধে। নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দেশ থাকলেও দীর্ঘ ১০ মাস অতিবাহিত হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন এক সংখ্যালঘু বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা।
জানা গেছে, উপজেলার আঠারবাড়ী ইউনিয়নের উত্তরবণগাঁও (করবাড়ী) গ্রামের ওই পরিবারের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, সি.এস রেকর্ড অনুযায়ী তারা জোতদার ও ভোগদখলকারী ছিলেন। তবে পরবর্তীতে আর.ও.আর রেকর্ডে ভুলক্রমে ভিন্ন ব্যক্তিদের নামে পৃথক খতিয়ান খোলা হয়। এর প্রেক্ষিতে তারা ১৯৭৭ সালে ঈশ্বরগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে (মামলা নং ১১২/১৯৭৭) মামলা দায়ের করে রায় পান।
উক্ত রায়ের ভিত্তিতে প্রশাসন ৫৪ ধারার আওতায় রেকর্ড সংশোধন করে এবং সরকার তাদের কাছ থেকে খাজনা গ্রহণের মাধ্যমে মালিকানা স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে একই জমি বি.আর.এস রেকর্ডে ভুলক্রমে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক, ময়মনসিংহ-এর নামে বাজার শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
এ অবস্থায় ভুক্তভোগী পরিবার পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালত কর্তৃক নিয়োজিত আমিন কমিশনার তদন্ত শেষে জমির পরিমাণ ৩৭ শতাংশ নির্ধারণ করে প্রতিবেদন ও স্কেচ ম্যাপ দাখিল করেন।
পরবর্তীতে আদালত পূর্ববর্তী রায়, খাজনা প্রদান এবং কমিশনারের প্রতিবেদনের আলোকে ভুক্তভোগী পরিবারের স্বত্ব বহাল রেখে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে বি.আর.এস রেকর্ড সংশোধনের রায় দেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, আদালতের এই রায় বাস্তবায়নের জন্য একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নতুন খতিয়ান খোলা বা খাজনা গ্রহণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং জমির পাশে সরকারি জমি থাকার অজুহাতে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছে বলে দাবি পরিবারের।
এদিকে, সরকারের পক্ষে পরপর দুইজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) তদন্ত প্রতিবেদনে জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং হাইকোর্টের রায় বিদ্যমান উল্লেখ করলেও বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি।
পরে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার প্রার্থনায় হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নং ৮২৩১/২০২৫) দায়ের করেন। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৯ মে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ (রুল নিসি) প্রদান করেন এবং একই সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট নির্দেশ দেন।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রায় ১০ মাস পার হলেও জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঈশ্বরগঞ্জ এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, তারা একাধিকবার আবেদন ও আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করলেও প্রতিকার পাননি। এমনকি লিগ্যাল নোটিশের পর বিষয়টি “প্রক্রিয়াধীন” দেখানোর চেষ্টা করা হলেও তা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী “নিষ্পত্তি” হিসেবে গণ্য হয় না।
পরিবারের সদস্য তাপস কর জানান, লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাকে ফোনে যোগাযোগ করে বলেন, “মামলা করে টাকা খরচ না করে তদবিরের মাধ্যমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ফাইল ছাড়িয়ে নিতে।” এ বক্তব্যে তারা আরও উদ্বিগ্ন ও হতাশ হয়েছেন বলে জানান।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, হাইকোর্টের স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক নির্দেশ দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়ন না হওয়া আইনের শাসন ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তাপস কর, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি 


