নারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জরায়ুমুখ ক্যানসার। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি Cervical Cancer নামে পরিচিত। জরায়ুর নিচের অংশ, অর্থাৎ যোনিপথের সঙ্গে যুক্ত অংশকে জরায়ুমুখ বা Cervix বলা হয়। এই অংশের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন থেকে ধীরে ধীরে ক্যানসার তৈরি হতে পারে।
তবে আশার বিষয় হলো—জরায়ুমুখ ক্যানসার অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব এবং সময়মতো চিকিৎসা নিলে সুস্থ হওয়ার সুযোগ থাকে। নিয়মিত স্ক্রিনিং, প্রয়োজনীয় টিকা এবং ঝুঁকির বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতা এই রোগ প্রতিরোধ ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জরায়ুমুখ ক্যানসার কী?
জরায়ুমুখে থাকা কোষ যখন অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন সেখানে ক্যানসার সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত এই পরিবর্তন একদিনে ক্যানসারে পরিণত হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ক্যানসারে পরিণত হওয়ার আগেই এসব পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ—HPV সংক্রমণ
জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে Human Papillomavirus (HPV)-এর দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। HPV একটি অত্যন্ত সাধারণ ভাইরাস এবং এর কিছু উচ্চঝুঁকির ধরন দীর্ঘদিন শরীরে থাকলে জরায়ুমুখের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
তবে HPV সংক্রমণ হলেই যে জরায়ুমুখ ক্যানসার হবে, তা নয়। অনেক HPV সংক্রমণ শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থার মাধ্যমে নিজে থেকেই দূর হয়ে যায়। ঝুঁকি তৈরি হয় যখন উচ্চঝুঁকির HPV সংক্রমণ দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকে এবং কোষে পরিবর্তন ঘটায়।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
১. অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত
স্বাভাবিক মাসিকের সময়ের বাইরে রক্তপাত, মাসিকের পরিমাণ বা সময়ের অস্বাভাবিক পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
২. যৌনমিলনের পর রক্তপাত
সহবাসের পর অস্বাভাবিকভাবে রক্তপাত হওয়া জরায়ুমুখের বিভিন্ন সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হতে পারে। এমন হলে বিষয়টি অবহেলা না করে গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. অস্বাভাবিক যোনি স্রাব
দুর্গন্ধযুক্ত, পানির মতো বা রক্তমিশ্রিত অস্বাভাবিক যোনি স্রাব দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
৪. তলপেটে বা পেলভিক এলাকায় ব্যথা
দীর্ঘস্থায়ী তলপেট, কোমর বা পেলভিক এলাকায় ব্যথা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তবে অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে এ ধরনের ব্যথা থাকলে পরীক্ষা করানো জরুরি।
৫. সহবাসের সময় ব্যথা
সহবাসের সময় অস্বাভাবিক ব্যথা হলে কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। এটি সবসময় ক্যানসারের লক্ষণ নয়, কিন্তু দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. রোগ বাড়লে প্রস্রাব বা পায়খানায় সমস্যা
রোগের উন্নত পর্যায়ে আশপাশের অঙ্গ আক্রান্ত হলে প্রস্রাব বা পায়খানার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। পা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যাও হতে পারে।
মনে রাখা জরুরি: এসব লক্ষণ অন্য অনেক সাধারণ রোগেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে জরায়ুমুখ ক্যানসার হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের মাধ্যমেই রোগ নির্ণয় করা যায়।
কেন হয় জরায়ুমুখ ক্যানসার?
জরায়ুমুখ ক্যানসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো দীর্ঘস্থায়ী উচ্চঝুঁকির HPV সংক্রমণ। তবে কিছু বিষয় রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- দীর্ঘস্থায়ী উচ্চঝুঁকির HPV সংক্রমণ
- HPV টিকা না নেওয়া
- ধূমপান
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকা
- HIV বা অন্যান্য কারণে দুর্বল ইমিউন সিস্টেম
- দীর্ঘদিন স্ক্রিনিং না করা
- কিছু ক্ষেত্রে একাধিক যৌনসঙ্গীর কারণে HPV সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি
- অল্প বয়সে যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে HPV সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি
- অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণের উপস্থিতি
তবে কোনো নারী এসব ঝুঁকির এক বা একাধিকটির মধ্যে থাকলেই যে তার জরায়ুমুখ ক্যানসার হবে—এমন নয়।
জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে কী করবেন?
HPV টিকা নিন
HPV টিকা জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। বয়স ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী টিকা দেওয়ার সময়সূচি ভিন্ন হতে পারে। তাই স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছ থেকে সঠিক পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিয়মিত স্ক্রিনিং করুন
জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে নিয়মিত স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। HPV test, Pap test বা Visual Inspection with Acetic Acid (VIA)—দেশ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের স্ক্রিনিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
কোন বয়সে এবং কত বছর পরপর পরীক্ষা করা হবে, তা ব্যক্তির বয়স, পূর্বের পরীক্ষার ফলাফল ও স্থানীয় জাতীয় নির্দেশনার ওপর নির্ভর করতে পারে।
ধূমপান থেকে দূরে থাকুন
ধূমপান জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ধূমপান বন্ধ করা এবং পরোক্ষ ধূমপান থেকেও যতটা সম্ভব দূরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
অস্বাভাবিক রক্তপাত অবহেলা করবেন না
বিশেষ করে সহবাসের পর রক্তপাত, মাসিকের বাইরে রক্তপাত বা মেনোপজের পর রক্তপাত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকুন
HPV মূলত যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। নিরাপদ যৌন আচরণ সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে কনডম HPV সংক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না, কারণ ভাইরাসটি যৌনাঙ্গের আশপাশের ত্বকের সংস্পর্শেও ছড়াতে পারে।
স্ক্রিনিং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জরায়ুমুখ ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক নারীর কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে শুধু লক্ষণের ওপর নির্ভর করলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।
স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে জরায়ুমুখে ক্যানসারের আগের অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এসব পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা গেলে ভবিষ্যতে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়।
রোগ নির্ণয় হলে কি চিকিৎসা সম্ভব?
জরায়ুমুখ ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসা রোগের পর্যায়, ক্যানসারের ধরন, রোগীর বয়স ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
চিকিৎসায় প্রয়োজন অনুযায়ী—
- অস্ত্রোপচার
- রেডিওথেরাপি
- কেমোথেরাপি
- অন্যান্য আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা
ব্যবহার করা হতে পারে। কোন চিকিৎসা প্রয়োজন তা ক্যানসার বিশেষজ্ঞ নির্ধারণ করেন।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো সমস্যা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
• সহবাসের পর বারবার রক্তপাত
• মাসিকের বাইরে অস্বাভাবিক রক্তপাত
• মেনোপজের পর রক্তপাত
• দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক বা দুর্গন্ধযুক্ত যোনি স্রাব
• দীর্ঘস্থায়ী তলপেট বা পেলভিক ব্যথা
• সহবাসের সময় অস্বাভাবিক ব্যথা
• চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্ক্রিনিংয়ের সময় হয়ে যাওয়া
শেষ কথা
জরায়ুমুখ ক্যানসার নিয়ে ভয় পাওয়ার চেয়ে সচেতন হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে লজ্জা বা ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বয়স ও স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি অনুযায়ী HPV টিকা এবং নিয়মিত জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
বিশেষ সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। কোনো উপসর্গ থাকলে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় বা ওষুধ গ্রহণ না করে নিবন্ধিত চিকিৎসক/গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

অনলাইন ডেস্ক 













