চুল দ্রুত লম্বা ও ঘন করার নানা ঘরোয়া পদ্ধতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বিভিন্ন পরামর্শ দেখা যায়। এর মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—রাতে ঘুমানোর আগে চুল বেণি করে রাখলে নাকি চুল দ্রুত বাড়ে। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস অনুসরণ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি বেণি করে ঘুমালে চুলের বৃদ্ধির গতি বেড়ে যায়?
চুলের যত্ন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন পরামর্শ অনুযায়ী, বেণি করে ঘুমানো সরাসরি চুলের বৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেয়—এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। মানুষের মাথার চুল সাধারণত নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়ায় বৃদ্ধি পায়। চুলের বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, বয়স, হরমোন, পুষ্টি, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও মাথার ত্বকের অবস্থার মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাতে চুল বেণি করে রাখার কোনো উপকার নেই। সঠিক নিয়মে এবং খুব বেশি শক্ত করে না বাঁধলে বেণি চুলের জট ও ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করতে পারে। ফলে চুল ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে। এতে চুলের দৈর্ঘ্য ধরে রাখা সহজ হতে পারে এবং বাইরে থেকে মনে হতে পারে যে চুল তুলনামূলক দ্রুত বাড়ছে।
চুল কীভাবে বাড়ে?
মাথার প্রতিটি চুলের গোড়ায় থাকা হেয়ার ফলিকল বা চুলের ফলিকল থেকেই চুলের বৃদ্ধি ঘটে। ফলিকলের ভেতরের কোষ বিভাজন ও বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন চুলের গঠন হয়।
চুলের বৃদ্ধি মূলত কয়েকটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। এর মধ্যে সক্রিয় বৃদ্ধির পর্যায়কে অ্যানাজেন (Anagen) বলা হয়। এরপর চুল পরিবর্তন পর্যায় এবং বিশ্রাম পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। ফলে চুলের বৃদ্ধি ও ঝরে পড়া একটি স্বাভাবিক চক্রের অংশ।
তাই শুধু রাতে বেণি করার মাধ্যমে চুলের ফলিকলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
তাহলে বেণি করে ঘুমানোর উপকার কী?
ঘুমের সময় বালিশের সঙ্গে চুলের বারবার ঘর্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে লম্বা, শুষ্ক বা কোঁকড়ানো চুলে এতে জট তৈরি এবং চুল ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
হালকা করে বেণি করলে চুল একসঙ্গে গুছিয়ে থাকে। এতে ঘুমের সময় চুলের অতিরিক্ত জট কমতে পারে এবং ঘর্ষণজনিত কিছু ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
অর্থাৎ, বেণি চুলকে দ্রুত বাড়ানোর চেয়ে চুলের ভাঙন কমাতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করতে পারে।
খুব শক্ত করে বেণি করা কি ভালো?
না। চুল শক্ত করে টেনে বেণি করা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দীর্ঘ সময় চুলের গোড়ায় টান পড়লে চুলের ফলিকলের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। নিয়মিত ও দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত টান দিয়ে চুল বাঁধার ফলে চুল ভেঙে যাওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে টানজনিত চুল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে ঘুমানোর সময় খুব শক্ত করে বেণি বা পনিটেল করা এড়িয়ে চলা ভালো।
রাতে চুল কীভাবে বাঁধবেন?
চুল বেণি করে ঘুমাতে চাইলে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা যেতে পারে—
- বেণি খুব শক্ত করে বাঁধবেন না।
- চুলের গোড়ায় অতিরিক্ত টান দেবেন না।
- নরম ও ঢিলেঢালা হেয়ার টাই ব্যবহার করতে পারেন।
- ভেজা চুল শক্ত করে বেঁধে ঘুমানো এড়িয়ে চলুন।
- চুলে অতিরিক্ত জট থাকলে আগে ধীরে ধীরে আঁচড়ে নিন।
- চুলের ধরন অনুযায়ী নিয়মিত পরিষ্কার ও পরিচর্যা করুন।
- অতিরিক্ত হিট স্টাইলিং ও রাসায়নিক ব্যবহারে সতর্ক থাকুন।
চুল দ্রুত ও স্বাস্থ্যকরভাবে বাড়াতে কী গুরুত্বপূর্ণ?
চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য শুধু বাহ্যিক পরিচর্যা যথেষ্ট নয়। শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ভিটামিনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। তাই সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন চুলের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে চুল অস্বাভাবিকভাবে পড়তে থাকলে বা হঠাৎ চুল পাতলা হয়ে গেলে শুধু ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ চুল পড়ার পেছনে পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনজনিত সমস্যা, কিছু রোগ, ওষুধ কিংবা অন্যান্য কারণ থাকতে পারে।
বেণি করলে কি চুল লম্বা দেখায়?
অনেক সময় বেণি করার পর চুলের জট কমে এবং চুল ভাঙার হার কম থাকায় কয়েক মাস পর চুল তুলনামূলক বেশি লম্বা মনে হতে পারে। কিন্তু এটিকে চুলের বৃদ্ধির গতি বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে ধরা ঠিক নয়।
সহজভাবে বললে, চুলের বৃদ্ধি এবং চুলের দৈর্ঘ্য ধরে রাখা—দুটি আলাদা বিষয়। বেণি চুলের বৃদ্ধির জৈবিক হার বাড়ায় না; তবে সঠিকভাবে করলে চুলের ভাঙন কমিয়ে বিদ্যমান দৈর্ঘ্য ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
শেষ কথা
রাতে বেণি করে ঘুমানো চুলের যত্নের একটি অভ্যাস হতে পারে, কিন্তু এটিকে চুল দ্রুত বাড়ানোর বৈজ্ঞানিক উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ঢিলেঢালা বেণি চুলের জট ও ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু খুব শক্ত করে বেণি করলে বরং চুলের ক্ষতি হতে পারে।
তাই চুল দ্রুত লম্বা করার কোনো বিশেষ কৌশলের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাবার, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত পরিচর্যা এবং চুলের ধরন অনুযায়ী সঠিক যত্ন নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লাইফস্টাইল ডেস্ক 













