ঢাকা , রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ
নারীদের নাক-কান ছিদ্র ও অলংকার পরিধান: ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ও ফিকাহভিত্তিক বিশ্লেষণ

নাক-কান ছিদ্র: ইসলামে বৈধতা

মানুষ স্বভাবতই সৌন্দর্যপ্রিয়। বিশেষ করে নারীদের মাঝে শালীনতার পরিসরে নিজেকে সাজানো ও অলংকার পরিধানের প্রবণতা মানবীয় স্বাভাবিক চাহিদারই বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম এই প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করেনি; বরং তা একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে থেকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও শরিয়তের কিছু নির্ধারিত বিধান রয়েছে, যা জানা ও মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নাক-কান ছিদ্র: বৈধতা না সৃষ্টির পরিবর্তন?
নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান—এ বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে: এটি কি বৈধ, নাকি আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত? ইসলামী ফিকাহ ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, যা বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের জন্য সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা বৈধ, যদি তা শালীনতা ও শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে। আর সেই পরিসরেই নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

হাদিসের আলোকে প্রমাণ
সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, ঈদের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের সদকা দিতে উৎসাহিত করলে তারা তাদের কানের দুল (খুরস) ও গলার অলংকার খুলে দান করেছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৮৩)। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সাহাবি নারীরা কানে দুল পরতেন, যা কানের ছিদ্র ছাড়া সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাসুল (সা.) এ বিষয়ে কোনো আপত্তি করেননি; বরং নীরব সম্মতি প্রদান করেছেন, যা শরিয়তের ভাষায় অনুমোদনের প্রমাণ।

আরেক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, নারীরা কানের অলংকার দ্বারা নিজেদের সাজাতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৮৯)। এটি প্রমাণ করে যে কানে ছিদ্র করা সে সময়ের স্বীকৃত ও প্রচলিত একটি বিষয় ছিল।

ফিকাহবিদদের মতামত
ইসলামী ফিকাহের গ্রন্থগুলোতেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়। হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আদ দুররুল মুখতার-এ উল্লেখ আছে যে, মেয়েদের কান ফোড়ানোতে কোনো দোষ নেই, কারণ এটি সমাজে সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। রাদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে, নারীরা নিজেদের সাজানোর জন্য যে বিষয়গুলো ব্যবহার করে, তা বৈধ—যেমন কানের দুল পরার জন্য কান ফোড়ানো।

অন্যদিকে শাফিঈ মাজহাবও একইভাবে নারীদের জন্য নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধানকে বৈধ বলে মত দিয়েছে।

সৃষ্টির পরিবর্তন নয় কেন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নাক বা কান ছিদ্র করা ‘সৃষ্টির বিকৃতি’ হিসেবে গণ্য হয় না। কারণ এটি শরীরে স্থায়ী বিকলাঙ্গতা সৃষ্টি করে না; বরং এটি একটি স্বাভাবিক ও সাময়িক পরিবর্তন, যা সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে স্বীকৃত।

পুরুষদের ক্ষেত্রে বিধান
তবে এ ক্ষেত্রে পুরুষদের জন্য বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামে পুরুষদের জন্য নাক বা কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান করা হারাম। কারণ এতে নারীদের অনুকরণ করা হয়, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ফিকাহের গ্রন্থ আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা-তেও এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

উপসংহার
সার্বিকভাবে বলা যায়, নারীদের জন্য নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ এবং এটি স্বাভাবিক সৌন্দর্যচর্চার অন্তর্ভুক্ত। এটি সৃষ্টির বিকৃতি নয়; বরং অনুমোদিত একটি মাধ্যম। তবে শর্ত হলো—এতে যেন অপব্যয়, অহংকার বা শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় যুক্ত না হয়।

অন্যদিকে, পুরুষদের জন্য এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত, নিজের জীবনযাপনকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করা এবং বৈধতার মধ্যেই সৌন্দর্যের অন্বেষণ করা।

সর্বাধিক পঠিত

অভিনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী, প্রথম দিনেই আলোচনায় থালাপতি বিজয়

নারীদের নাক-কান ছিদ্র ও অলংকার পরিধান: ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ও ফিকাহভিত্তিক বিশ্লেষণ

নাক-কান ছিদ্র: ইসলামে বৈধতা

আপডেট সময়: ০৯:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

মানুষ স্বভাবতই সৌন্দর্যপ্রিয়। বিশেষ করে নারীদের মাঝে শালীনতার পরিসরে নিজেকে সাজানো ও অলংকার পরিধানের প্রবণতা মানবীয় স্বাভাবিক চাহিদারই বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম এই প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করেনি; বরং তা একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে থেকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও শরিয়তের কিছু নির্ধারিত বিধান রয়েছে, যা জানা ও মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নাক-কান ছিদ্র: বৈধতা না সৃষ্টির পরিবর্তন?
নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান—এ বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে: এটি কি বৈধ, নাকি আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত? ইসলামী ফিকাহ ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, যা বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের জন্য সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা বৈধ, যদি তা শালীনতা ও শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে। আর সেই পরিসরেই নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

হাদিসের আলোকে প্রমাণ
সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, ঈদের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের সদকা দিতে উৎসাহিত করলে তারা তাদের কানের দুল (খুরস) ও গলার অলংকার খুলে দান করেছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৮৩)। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সাহাবি নারীরা কানে দুল পরতেন, যা কানের ছিদ্র ছাড়া সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাসুল (সা.) এ বিষয়ে কোনো আপত্তি করেননি; বরং নীরব সম্মতি প্রদান করেছেন, যা শরিয়তের ভাষায় অনুমোদনের প্রমাণ।

আরেক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, নারীরা কানের অলংকার দ্বারা নিজেদের সাজাতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৮৯)। এটি প্রমাণ করে যে কানে ছিদ্র করা সে সময়ের স্বীকৃত ও প্রচলিত একটি বিষয় ছিল।

ফিকাহবিদদের মতামত
ইসলামী ফিকাহের গ্রন্থগুলোতেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়। হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আদ দুররুল মুখতার-এ উল্লেখ আছে যে, মেয়েদের কান ফোড়ানোতে কোনো দোষ নেই, কারণ এটি সমাজে সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। রাদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে, নারীরা নিজেদের সাজানোর জন্য যে বিষয়গুলো ব্যবহার করে, তা বৈধ—যেমন কানের দুল পরার জন্য কান ফোড়ানো।

অন্যদিকে শাফিঈ মাজহাবও একইভাবে নারীদের জন্য নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধানকে বৈধ বলে মত দিয়েছে।

সৃষ্টির পরিবর্তন নয় কেন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নাক বা কান ছিদ্র করা ‘সৃষ্টির বিকৃতি’ হিসেবে গণ্য হয় না। কারণ এটি শরীরে স্থায়ী বিকলাঙ্গতা সৃষ্টি করে না; বরং এটি একটি স্বাভাবিক ও সাময়িক পরিবর্তন, যা সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে স্বীকৃত।

পুরুষদের ক্ষেত্রে বিধান
তবে এ ক্ষেত্রে পুরুষদের জন্য বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামে পুরুষদের জন্য নাক বা কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান করা হারাম। কারণ এতে নারীদের অনুকরণ করা হয়, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ফিকাহের গ্রন্থ আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা-তেও এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

উপসংহার
সার্বিকভাবে বলা যায়, নারীদের জন্য নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ এবং এটি স্বাভাবিক সৌন্দর্যচর্চার অন্তর্ভুক্ত। এটি সৃষ্টির বিকৃতি নয়; বরং অনুমোদিত একটি মাধ্যম। তবে শর্ত হলো—এতে যেন অপব্যয়, অহংকার বা শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় যুক্ত না হয়।

অন্যদিকে, পুরুষদের জন্য এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত, নিজের জীবনযাপনকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করা এবং বৈধতার মধ্যেই সৌন্দর্যের অন্বেষণ করা।