যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আসন্ন ভারত সফরকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সফরসূচি অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে মুম্বাইয়ে বৈঠক করবেন রুবিও। এরপর গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত একটি বৃহৎ তেল শোধনাগার পরিদর্শনের কথা রয়েছে তাঁর। তবে সফরের তালিকায় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি না থাকায় দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রশ্ন তুলেছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কি নিজ দেশের ভেতরেই একজন বিদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে যেতে বলা হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের এক বক্তব্যের পর এ বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন প্রশাসন আশা করছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা মুম্বাইয়ে গিয়ে রুবিওর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন। বিষয়টি নিয়ে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতারা সমালোচনা করে বলেছেন, এ ধরনের বক্তব্য ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, রুবিওর সফরসূচি নিয়ে বিতর্ককে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের স্থান নির্ধারণের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ, শুল্কনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়ে চলমান মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে সফরটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
মুম্বাইয়ে জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক
সফরসূচি অনুযায়ী, মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সি৫+১’ কাঠামোর বৈঠকে অংশ নিতে উজবেকিস্তানের সমরকন্দ সফর শেষে রুবিওর ভারতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তাঁর বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ের বৈঠকে জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এসব বিষয় দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। অন্যদিকে, ভারতও প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
তবে বৈঠকের স্থান ও সফরের কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের কারণে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আলোচনার পাশাপাশি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
জামনগরের তেল শোধনাগার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুবিও গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ পরিচালিত বৃহৎ তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একক স্থানের এই শোধনাগার ভারতের জ্বালানি পরিশোধন ও রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সফরের অংশ হিসেবে আম্বানি পরিবারের আয়োজিত একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
জামনগরকে সফরসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে জ্বালানি ও বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত বিশ্বের বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশগুলোর একটি। দেশটির শিল্প, পরিবহন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী। ফলে ভারতের একটি বড় তেল শোধনাগার পরিদর্শন দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের আন্তর্জাতিক জ্বালানি ব্যবসাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যম বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। ওয়াশিংটনও ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নতুন একটি তেল শোধনাগার নির্মাণের সঙ্গে রিলায়েন্সের বিনিয়োগ যুক্ত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মার্চে এ প্রকল্পকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে প্রকল্পের ঘোষিত অঙ্ক, বিনিয়োগের প্রকৃত পরিমাণ এবং বাস্তবায়নের অবস্থা এক বিষয় নয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দিল্লি বাদ পড়ায় প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা
রুবিও কেন নয়াদিল্লি সফর করছেন না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে সফরসূচিতে রাজধানী বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য জয়শঙ্করসহ ভারতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা মুম্বাইয়ে যাবেন বলে ওয়াশিংটন আশা করছে।
রাষ্ট্রদূতের এ বক্তব্যের পর কংগ্রেস নেতারা বিষয়টিকে ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখেন।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী আরও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, মার্কো রুবিও যেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজের কর্মচারীর মতো মুম্বাইয়ে তলব করছেন।
কংগ্রেস নেতা পবন খেরাও এ বিষয়ে সমালোচনা করে বলেন, ভারতের মাটিতে বিদেশি সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এভাবে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হওয়ার প্রত্যাশা জানানো নজিরবিহীন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জয়শঙ্করকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তলব’ করা হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে বৈঠকের জন্য মুম্বাইয়ে যাওয়ার প্রত্যাশার কথা বলা হয়েছে। ফলে ‘তলব’ শব্দটি মূলত বিরোধী নেতাদের রাজনৈতিক সমালোচনার অংশ হিসেবে এসেছে।
কূটনৈতিকভাবে বৈঠকের স্থান নির্ধারণ অনেক সময় সফরের উদ্দেশ্য, সময়, নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক কর্মসূচি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু রাজধানী সফর না করার বিষয় থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে অমীমাংসিত বিরোধ
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বাণিজ্য। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পণ্য আমদানি-রপ্তানি, বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্ক এবং বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়ে আলোচনা চলছে।
গত বছর বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের অধিকাংশ পণ্যের ওপর মোট ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার কাঠামোর আওতায় শুল্কের হার কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। তবে পরবর্তী আলোচনা প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ চলতি মাসে বাণিজ্য আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত চুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ভারতের উদ্বেগের জায়গা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা যেন শুল্কের কারণে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারিয়ে না ফেলেন। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়টিও ভারতের বাণিজ্যনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার এবং তুলনামূলক সুবিধাজনক শুল্কহার নিশ্চিত করা গেলে দেশটির উৎপাদন ও রপ্তানি খাত উপকৃত হতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনও ভারতের বাজারে মার্কিন পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার বাড়াতে আগ্রহী।
এ কারণে রুবিওর সফরে বাণিজ্যিক সমঝোতার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। তবে বৈঠক থেকেই কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
বাণিজ্য বিরোধের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানিও দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের মতপার্থক্যের কারণ হয়ে রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে রাশিয়ার জ্বালানি খাত থেকে আয় কমানোর উদ্যোগও রয়েছে। তবে ভারত নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে।
ভারতের জন্য রাশিয়ার তেল গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পেছনে মূল্য, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং দেশের বিশাল জ্বালানি চাহিদার বিষয় রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো গেলে মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা সীমিত করা সম্ভব হতে পারে।
এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নীতিগত টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নতুন আইনে রুশ তেল ও গ্যাসের বড় আমদানিকারক দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এ ধরনের বিধানের প্রয়োগ, কার্যকারিতা এবং পরবর্তী নির্বাহী সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর বিষয়টিও ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে ভারত কীভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে, তা দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা অব্যাহত
বাণিজ্য ও জ্বালানি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা পুরোপুরি থেমে নেই। বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম এবং সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার গুরুত্ব বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। বিশেষ করে এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থের কিছু মিল রয়েছে।
ভারতও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক সমীর লালওয়ানির মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে জনমনে ধারণার অবনতি ঘটলেও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি এখনো টিকে আছে।
প্রতিবেদনে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। এ তথ্য দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপ্তি তুলে ধরে। তবে বাণিজ্যের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে পণ্য ও সেবা অন্তর্ভুক্তির পদ্ধতি এবং হিসাবের ভিত্তি বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থ তাদের আলোচনার টেবিলে ধরে রাখতে পারে।
সফর ঘিরে কূটনৈতিক বার্তা কী?
মার্কো রুবিওর ভারত সফর ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি বিষয়—বৈঠকের স্থান, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং জ্বালানিনীতি।
ভারতের বিরোধী দলগুলো সফরসূচিকে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরলেও কূটনৈতিক পর্যায়ে এর প্রকৃত তাৎপর্য নির্ধারণের জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র কেন নয়াদিল্লির পরিবর্তে মুম্বাইকে বৈঠকের স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসায় বিতর্কের অবসানও ঘটেনি।
অন্যদিকে, জামনগরের শোধনাগার পরিদর্শন এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি থেকে বোঝা যায়, সফরে জ্বালানি ও বিনিয়োগের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি, রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে মতপার্থক্য এবং প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে কী আলোচনা হয়, তা পর্যবেক্ষণ করবেন সংশ্লিষ্ট মহল।
সব মিলিয়ে, রুবিওর দিল্লি সফর বাদ দিয়ে মুম্বাইয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক শুধু আনুষ্ঠানিক প্রটোকলের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কৌশলগত দিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার বিষয়।
সফর শেষে কোনো নতুন সমঝোতা বা নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা আসে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সূত্র: আল-জাজিরা

অনলাইন ডেস্ক 







