বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে কর্মস্থলগামী মানুষ, দূরপাল্লার যাত্রী, পরিবহন চালকসহ সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। ফলে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান এবং মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে আলোচনার মাধ্যমে এখনো পরিস্থিতির চূড়ান্ত সমাধান হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আশুলিয়ায় ৫০ কারখানায় সাধারণ ছুটি, মিরপুরেও বিক্ষোভ
এদিকে পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ শুধু গাজীপুরেই সীমাবদ্ধ নেই। এর আগের দিন রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুর এবং সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।
শ্রমিকদের আন্দোলন ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আশুলিয়ার অন্তত ৫০টি তৈরি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এতে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
অন্যদিকে, রোববার সকাল থেকে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১২ নম্বরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। তাদের বিক্ষোভের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ওই এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
এর আগের দিন শনিবার (৩১ অক্টোবর) একই দাবিতে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকরা। টানা কয়েক দিনের আন্দোলনে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার আশঙ্কা পুলিশের
পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে তৃতীয় কোনো পক্ষের সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন বোর্ডের মাধ্যমেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও আন্দোলনকারীরা সড়ক ছাড়তে রাজি হচ্ছিলেন না। পুলিশের কাছে মনে হয়েছে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে।
তিনি আরও জানান, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া ও মজুরি সংক্রান্ত বিষয়টি নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে। তবে সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করার বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা, উদ্বেগে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা
টানা কয়েক দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং কারখানায় সাধারণ ছুটির ঘটনায় ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গাজীপুর, আশুলিয়া ও মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও যোগাযোগ এলাকাগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এ মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হলে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনকে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহন ও পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, মালিকপক্ষের সক্ষমতা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা জরুরি। পাশাপাশি শ্রমিকদের আন্দোলন যেন সহিংসতা বা জনদুর্ভোগের কারণ না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের ধারাবাহিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গাজীপুর, আশুলিয়া ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন না হলে শিল্প উৎপাদন, সড়ক যোগাযোগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শ্রমিক, মালিকপক্ষ ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ খবর ডেস্ক 



