সন্তান নেওয়া কিংবা না নেওয়া—একজন নারীর জীবনের অত্যন্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। মাতৃত্বের বিষয়টি নিয়ে একজন নারীর নিজস্ব ইচ্ছা, শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্ব থাকলেও সমাজে এখনো অনেক নারীকে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও চাপের মুখে পড়তে হয়। এবার মাতৃত্ব, সন্তানধারণের সক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে নিজের জীবনের এক সংবেদনশীল অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন বলিউড অভিনেত্রী শ্বেতা ত্রিপাঠী।
অভিনেত্রী জানিয়েছেন, চিকিৎসকের কাছ থেকে নিজের সন্তানধারণের সক্ষমতা কম থাকার বিষয়টি জানার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কারণ, মা হবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সম্প্রতি অভিনেত্রী সোহা আলী খানের একটি পডকাস্টে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে বিয়ে, মাতৃত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেন শ্বেতা ত্রিপাঠী। সেখানে নিজের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে সন্তানধারণের বিষয়টি নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করেন তিনি।
শ্বেতা জানান, জীবনের একটা পর্যায়ে সন্তান নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। মা হওয়ার সঙ্গে যে বিপুল দায়িত্ব, ত্যাগ, শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিক প্রস্তুতি জড়িয়ে রয়েছে, তা কাছ থেকে উপলব্ধি করতে শুরু করেন তিনি।
অভিনেত্রীর ভাষায়, মা হওয়ার পর একজন নারী যেন এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান। তাঁর পরিচিত বন্ধু এবং নিজের ননদের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সেসব অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছে, সন্তান জন্ম দেওয়া কিংবা বড় করে তোলা মোটেও সহজ কোনো বিষয় নয়।
শ্বেতা বলেন, আগের প্রজন্মের নারীরা কীভাবে সংসার, সন্তান এবং নিজেদের অন্যান্য দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতেন, তা ভেবে তিনি বিস্মিত হন। তাঁর মতে, মাতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাস্তব দায়িত্ব ও ত্যাগ সম্পর্কে আগে থেকে নারীদের যথেষ্ট ধারণা দেওয়া হয় না। একজন মায়ের প্রতিদিনের সংগ্রাম, ধৈর্য, সাহস ও আত্মত্যাগের জন্য সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানান অভিনেত্রী।
সন্তানধারণের সক্ষমতা কম জানার পর ভেঙে পড়েছিলেন
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে শ্বেতা জানান, চিকিৎসকের কাছ থেকে সন্তানধারণের সক্ষমতা কম থাকার বিষয়টি জানার পর তাঁর খুব খারাপ লেগেছিল। কারণ, তিনি চেয়েছিলেন সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিতে।
অভিনেত্রীর কথায়, তিনি তখনো নিশ্চিত ছিলেন না যে আদৌ মা হতে চান কি না। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই যখন জানতে পারেন, তাঁর সন্তানধারণের সক্ষমতা কম, তখন বিষয়টি তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করে।
শ্বেতার বক্তব্য, তিনি চাননি অন্য কেউ এসে তাঁকে জানিয়ে দিক যে তিনি মা হতে পারবেন না। তাঁর কাছে বিষয়টি শুধু সন্তানধারণের সক্ষমতার ছিল না, বরং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার সঙ্গেও জড়িত ছিল।
এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অভিনেত্রী মূলত নারীর প্রজননস্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং মাতৃত্বের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছেন।
বিয়ে ও সন্তান নিয়ে পরিবারের চাপ ছিল না
পডকাস্টে সোহা আলী খান জানতে চান, বিয়ে কিংবা সন্তান নেওয়ার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল কি না শ্বেতাকে।
জবাবে অভিনেত্রী জানান, দুই পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা তাঁকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের নাতি-নাতনির মুখ দেখার ইচ্ছা থাকলেও তাঁরা কখনো সরাসরি চাপ সৃষ্টি করেননি। বরং তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছেন।
শ্বেতা ৩৩ বছর বয়সে বিয়ে করেন। তবে বিয়ের আগে তাঁকে পরিচিতজনদের কাছ থেকে প্রায়ই বিয়ে নিয়ে নানা প্রশ্ন শুনতে হতো। এসব প্রশ্ন তাঁকে বিরক্ত করত বলে জানান অভিনেত্রী।
তিনি বলেন, আশপাশের মানুষ প্রায়ই জানতে চাইতেন, কবে বিয়ে করছেন। তবে তাঁর বাবা-মা এ নিয়ে চাপ না দিলেও পরিচিতজনদের এমন প্রশ্ন তাঁর কাছে অস্বস্তিকর মনে হতো।
সন্তান নেওয়া নিয়েও সামাজিক প্রশ্নের মুখে নারী
বিয়ের পর সন্তান নেওয়া নিয়েও নারীদের যে নানা ধরনের ব্যক্তিগত ও অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, সেই অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন শ্বেতা।
অভিনেত্রী জানান, তাঁর ননদের সন্তান হওয়ার পর বাড়ির পরিচারিকারা তাঁকে সন্তান নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। তাঁকে বলা হতো, ‘এবার আপনার পালা, সুখবর কবে দিচ্ছেন?’
এ ধরনের প্রশ্নে বিব্রত হয়ে ননদের দিকে তাকাতেন শ্বেতা। পরিস্থিতি বুঝে তাঁর শাশুড়ি এগিয়ে এসে বিষয়টি সামাল দিতেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তান নেওয়ার বিষয়ে এমন সহযোগিতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মান পাওয়াকে নিজের সৌভাগ্য বলে মনে করেন অভিনেত্রী।
নারীর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানোর আহ্বান
শ্বেতা ত্রিপাঠীর এই বক্তব্য নতুন করে সামনে এনেছে নারীর মাতৃত্ব, প্রজননস্বাস্থ্য এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। একজন নারী কখন বিয়ে করবেন, কখন সন্তান নেবেন কিংবা আদৌ সন্তান নেবেন কি না—এসব সিদ্ধান্ত তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সন্তানধারণের সক্ষমতা নিয়ে চিকিৎসাগত কোনো সীমাবদ্ধতা থাকলে তা একজন নারীর জন্য মানসিকভাবে কঠিন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। আবার সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও সামাজিক প্রশ্ন ও প্রত্যাশা অনেক সময় তাঁদের অস্বস্তিতে ফেলে।
শ্বেতার অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, মাতৃত্ব কোনো সামাজিক প্রতিযোগিতা নয় কিংবা প্রত্যেক নারীর জন্য বাধ্যতামূলক কোনো জীবনধারা নয়। বরং একজন নারীর শারীরিক অবস্থা, মানসিক প্রস্তুতি এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সন্তান নেওয়া নিয়ে অযাচিত প্রশ্ন না করে নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখানোই হওয়া উচিত পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব।

বিনোদন ডেস্ক 



