কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তৈরি বিকৃত ছবি, ভুয়া অডিও এবং অশালীন কনটেন্ট ইন্টারনেট থেকে অপসারণের দাবিতে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য কঙ্গনা রানাওয়াত। তাঁর অনুমতি ছাড়া ছবি, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিগত পরিচিতি ব্যবহার করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর এবং মানহানিকর বিভিন্ন উপাদান অনলাইনে প্রচার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি আইনি প্রতিকার চেয়েছেন।
বিষয়টি ঘিরে ভারতের বিনোদন জগতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তির পরিচয়, কণ্ঠস্বর ও চেহারা নকল করার ঝুঁকি এবং তারকাদের ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। বিশেষ করে ডিপফেক ভিডিও, কৃত্রিম কণ্ঠস্বর এবং বাস্তব ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এ ধরনের অপব্যবহার মোকাবিলায় আইনি পদক্ষেপের গুরুত্ব বাড়ছে।
আদালতে কঙ্গনার আবেদন, বিবাদীদের প্রতি সমন
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিল্লি হাইকোর্টে বিচারপতি বিকাশ মহাজনের একক বেঞ্চে কঙ্গনা রানাওয়াতের দায়ের করা মামলার শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত মামলার বিবাদী পক্ষগুলোর প্রতি সমন জারি করেছেন।
কঙ্গনার আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি পর্নোগ্রাফিক, অশালীন ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা, সামাজিক ভাবমূর্তি এবং পেশাগত পরিচিতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। তাঁর অনুমতি ছাড়া ছবি ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে তৈরি এসব উপাদান অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া ক্ষতিকর উপাদান অপসারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কনটেন্টের অননুমোদিত ব্যবহার ও প্রচার বন্ধে প্রয়োজনীয় আইনি নির্দেশনার দাবি জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আদালতের সমন জারি করা মানেই অভিযোগগুলোর সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। মামলার পরবর্তী শুনানি ও আদালতের নির্দেশনার ওপরই বিষয়টির পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে।
ট্রোলিং ও মিম নয়, আপত্তি ক্ষতিকর কনটেন্টে
কঙ্গনার মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি সাধারণ ট্রোলিং, সমালোচনা কিংবা মিমের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা চাইছেন না বলে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বরং অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অনুমতি ছাড়া তাঁর পরিচিতি ব্যবহার করে তৈরি অশালীন, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর উপাদান।
এই অবস্থান অনলাইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যঙ্গ, সমালোচনা বা রম্য কনটেন্ট তৈরি করা এবং তাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া যৌন দৃশ্য বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য তৈরি করা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি, গোপনীয়তা, সুনাম ও পরিচিতির অপব্যবহারের মতো গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এ ধরনের মামলার গুরুত্ব হলো, ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণের দাবি কতটা যুক্তিসংগত এবং একই সঙ্গে বৈধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—তা নির্ধারণে আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
একই দিনে আদালতের দ্বারস্থ বিজয় দেবেরাকোন্ডা
কঙ্গনা রানাওয়াতের মামলার পাশাপাশি তেলেগু চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয় দেবেরাকোন্ডার দায়ের করা পৃথক একটি মামলাও একই দিনে শুনানির জন্য আসে।
বিজয়ের আইনজীবীদের অভিযোগ, তাঁর অনুমতি ছাড়া নাম, ছবি এবং এআই-নির্মিত উপাদান ব্যবহার করে বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছে। এসব উপাদানের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
আদালত এই মামলাতেও বিবাদীদের প্রতি সমন জারি করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এখানে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ এবং চূড়ান্ত রায়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়া হলে তা মামলার নিষ্পত্তির আগেই নির্দিষ্ট অধিকার বা স্বার্থ রক্ষার জন্য কার্যকর হতে পারে। তবে আদালতের নির্দিষ্ট লিখিত আদেশ যাচাই ছাড়া কোনো চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ব্যক্তিত্বের অধিকার রক্ষায় তারকাদের আইনি লড়াই
এআই প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে তারকাদের ব্যক্তিত্বের অধিকার বা ‘পার্সোনালিটি রাইটস’ নিয়ে আইনি তৎপরতা বেড়েছে। কঙ্গনা ও বিজয় দেবেরাকোন্ডার আগে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, অভিষেক বচ্চন, সালমান খান, পবন কল্যাণ, শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর, পডকাস্টার রাজ শমানি এবং ক্রিকেটার অভিষেক শর্মার মতো পরিচিত ব্যক্তিরাও তাঁদের পরিচিতি ও ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষায় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এসব মামলার পটভূমিতে রয়েছে ছবি, নাম, কণ্ঠস্বর, স্বাক্ষর, ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং কখনো কখনো এআই দিয়ে তৈরি কৃত্রিম দৃশ্যের অননুমোদিত ব্যবহার।
একজন পরিচিত ব্যক্তির নাম বা ছবি ব্যবহার করে ভুয়া বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা কিংবা আপত্তিকর ভিডিও তৈরি হলে তাঁর সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও প্রতারণার শিকার হতে পারেন। আবার পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর নকল করে ভুয়া বক্তব্য তৈরি করা হলে সেটি জনমত ও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ব্যক্তিত্বের অধিকার-সংক্রান্ত প্রতিটি মামলার ঘটনা, অভিযোগ ও আদালতের নির্দেশ আলাদা। তাই এক মামলার সিদ্ধান্ত অন্য মামলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন ধারণা করা যায় না।
কী এই এআই ডিপফেক?
ডিপফেক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি বা পরিবর্তিত এমন ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও, যা দেখে বা শুনে বাস্তব বলে মনে হতে পারে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মুখ অন্য ভিডিওতে বসানো, তাঁর কণ্ঠস্বর নকল করা কিংবা এমন বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব, যা তিনি বাস্তবে কখনো বলেননি।
প্রযুক্তিটির ইতিবাচক ব্যবহার থাকলেও অননুমোদিত ও প্রতারণামূলক প্রয়োগ নানা সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে যৌন হয়রানি, পরিচয় জালিয়াতি, মানহানি, আর্থিক প্রতারণা এবং ভুয়া তথ্য প্রচারে ডিপফেক ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তাঁর ছবি ব্যবহার করে অশালীন বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য তৈরি করা হলে তা শুধু প্রযুক্তিগত কারসাজির বিষয় থাকে না; পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে তা ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন বা অন্য আইনি অপরাধের প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায় ও করণীয়
এ ধরনের ঘটনা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করা, অভিযোগ গ্রহণ করা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং আইনসম্মত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা—এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও দেখেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে পরিচিত ব্যক্তি সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর বক্তব্য, আপত্তিকর দৃশ্য কিংবা অস্বাভাবিক কোনো দাবি সামনে এলে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই না করে তা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
ভুয়া কনটেন্টের শিকার হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তাঁর প্রতিনিধিরা প্রমাণ সংরক্ষণ, প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ দাখিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত সহায়তা নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারেন। অনলাইনে কোনো উপাদান সরিয়ে ফেলা গেলেও তার অনুলিপি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এআই যুগে ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষার নতুন চ্যালেঞ্জ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নতির ফলে ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর তৈরি বা পরিবর্তন করা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তির পরিচিতি ব্যবহার করে তৈরি উপাদানটি আসল, সম্পাদিত নাকি সম্পূর্ণ কৃত্রিম—তা সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে সব সময় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
এই বাস্তবতায় কঙ্গনা রানাওয়াত ও বিজয় দেবেরাকোন্ডার মতো পরিচিত ব্যক্তিদের আইনি পদক্ষেপ প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং অনলাইনে ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
দিল্লি হাইকোর্টের এই মামলাগুলোতে পরবর্তী সময়ে কী নির্দেশনা আসে, তা এআই-নির্মিত ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে আদালতের চূড়ান্ত অবস্থান, নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার পরিধি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কী ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়—সেসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আদালতের আনুষ্ঠানিক আদেশ ও পরবর্তী শুনানির তথ্য প্রয়োজন।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের অধিকার, সম্মতি, গোপনীয়তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কঙ্গনার মামলাকে কেন্দ্র করে সেই প্রশ্নই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অনলাইন ডেস্ক 







