সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোয়ালে ব্যথা, মুখ খুলতে অস্বস্তি কিংবা মাথাব্যথা—এ ধরনের সমস্যা অনেকের কাছেই পরিচিত। কেউ কেউ আবার ঘুম থেকে ওঠার পর দাঁতে শিরশির অনুভূতি বা কানে অস্বস্তি টের পান। এসব উপসর্গের একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ঘুমের মধ্যে অজান্তে দাঁতে দাঁত ঘষা বা চোয়াল শক্ত করে চেপে রাখা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে বলা হয় ‘ব্রুকসিজম’ (Bruxism)।
ব্রুকসিজম সবসময় শুধু দাঁত ঘষার শব্দ হিসেবে প্রকাশ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই বিষয়টি বুঝতে পারেন না। ঘুমের মধ্যে চোয়ালের পেশি বারবার শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে দাঁতের ক্ষয়, চোয়ালের জয়েন্টে অস্বস্তি এবং সকালে মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কেন ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষেন অনেকে?
ব্রুকসিজমের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সবার ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ করে না। তবে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ঘুমের কিছু সমস্যা এবং জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া যায়।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
দিনভর কাজের চাপ, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা মানসিক অস্থিরতা অনেক সময় ঘুমের মধ্যেও শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর একটি প্রকাশ হতে পারে দাঁত চেপে রাখা বা ঘষা। বিশেষ করে দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন অভ্যাস দেখা যেতে পারে।
দাঁতের অবস্থান ও চোয়ালের সমস্যা
উপরের ও নিচের দাঁতের সংযোগ বা কামড়ের ধরনে সমস্যা থাকলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চোয়ালের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। তবে দাঁতের অসমান গঠনই ব্রুকসিজমের একমাত্র কারণ—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা
নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়া বা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমজনিত শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যার সঙ্গে ঘুমের সময় দাঁত চেপে ধরার সম্পর্ক থাকতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ থাকলে শুধু দাঁতের চিকিৎসা নয়, ঘুমের সমস্যাটিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হতে পারে।
ক্যাফেইন ও অন্যান্য উদ্দীপক
বিশেষ করে বিকেল বা রাতে অতিরিক্ত চা, কফি কিংবা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণ ঘুমের মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি দাঁত ঘষার প্রবণতাও বাড়াতে পারে।
ব্রুকসিজমের লক্ষণ কী কী?
ঘুমের মধ্যে সমস্যাটি হওয়ায় অনেকেই প্রথম দিকে তা বুঝতে পারেন না। তবে কিছু লক্ষণ নিয়মিত দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সকালে মাথাব্যথা: ঘুম থেকে ওঠার পর কপাল, কানের পাশ বা মাথার দুই পাশে চাপধরনের ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
চোয়ালে ব্যথা বা শক্তভাব: সকালে চোয়াল শক্ত মনে হওয়া, মুখ খুলতে অস্বস্তি কিংবা খাবার চিবানোর সময় ব্যথা হতে পারে।
দাঁতে শিরশির অনুভূতি: দাঁতের ওপরের শক্ত আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠান্ডা, গরম বা মিষ্টি খাবারে সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে।
দাঁতের আকৃতিতে পরিবর্তন: দীর্ঘদিন দাঁত ঘষার ফলে দাঁতের ধার ক্ষয়ে গিয়ে আগের তুলনায় সমতল বা ছোট দেখাতে পারে।
কানে অস্বস্তি: চোয়ালের জয়েন্টের সমস্যার কারণে কানের আশপাশে ব্যথা বা চাপের অনুভূতি হতে পারে। তবে কানের সব ধরনের ব্যথার কারণ ব্রুকসিজম নয়।
জিহ্বা বা গালের ভেতরে দাঁতের দাগ: দীর্ঘ সময় দাঁত চেপে রাখার অভ্যাস থাকলে জিহ্বার পাশে বা গালের ভেতরে দাঁতের ছাপ দেখা যেতে পারে।
দীর্ঘদিন চললে কী ক্ষতি হতে পারে?
মাঝেমধ্যে দাঁত চেপে ধরা সবসময় বড় সমস্যা তৈরি করে না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বা ঘন ঘন ব্রুকসিজম থাকলে দাঁতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
এর ফলে—
দাঁতের এনামেল ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে পারে;
দাঁতে ফাটল বা ভাঙার ঝুঁকি বাড়তে পারে;
দাঁতের সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে;
চোয়ালের পেশিতে ব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে;
চোয়ালের জয়েন্টে বা টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্টে (TMJ) সমস্যা দেখা দিতে পারে;
মাথাব্যথা বা মুখমণ্ডলের ব্যথা বাড়তে পারে।
অতিরিক্তভাবে চোয়ালের পেশি দীর্ঘদিন বেশি সক্রিয় থাকলে কারও কারও মুখের নিচের অংশ কিছুটা চওড়া দেখাতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে হয় না।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়?
ব্রুকসিজমের কারণ ও তীব্রতার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। তবে দৈনন্দিন জীবনে কিছু অভ্যাস পরিবর্তন উপকারী হতে পারে।
ঘুমের আগে চোয়ালকে বিশ্রাম দিন
ঘুমানোর আগে কিছু সময় শান্ত পরিবেশে থাকুন। হালকা বই পড়া, শিথিল হওয়ার ব্যায়াম বা অন্য কোনো আরামদায়ক রুটিন মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
হালকা গরম সেঁক
চোয়ালের পেশিতে ব্যথা বা শক্তভাব থাকলে হালকা গরম সেঁক সাময়িক আরাম দিতে পারে। তবে অতিরিক্ত গরম ব্যবহার করা উচিত নয়।
দাঁত চেপে রাখার অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন থাকুন
দিনের বেলায় কাজের ফাঁকে নিজের চোয়াল শক্ত করে রাখা হচ্ছে কি না খেয়াল করুন। স্বাভাবিক অবস্থায় দাঁত সবসময় শক্ত করে পরস্পরের সঙ্গে চেপে থাকার কথা নয়। চোয়ালকে স্বাভাবিকভাবে আরাম দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
অতিরিক্ত চিবানো খাবার কমান
চোয়ালে ব্যথা বা অস্বস্তি থাকলে কিছুদিন খুব শক্ত খাবার, বরফ চিবানো বা অতিরিক্ত সময় ধরে চুইংগাম চিবানোর মতো অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
ক্যাফেইন গ্রহণের সময় খেয়াল করুন
বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে অতিরিক্ত চা-কফি পান করলে তা কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এতে ঘুমের মানও ভালো হতে পারে।
কখন ডেন্টিস্টের কাছে যাবেন?
সকালে নিয়মিত চোয়ালে ব্যথা, দাঁতে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, দাঁতের ক্ষয় বা ভাঙন, মুখ খুলতে সমস্যা কিংবা ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষার শব্দ সম্পর্কে পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে জানতে পারলে ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দাঁতের অবস্থা পরীক্ষা করে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে দাঁতকে অতিরিক্ত ঘষা থেকে সুরক্ষার জন্য কাস্টম-মেড নাইট গার্ড বা অক্লুসাল স্প্লিন্ট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। তবে সবার জন্য একই ধরনের ডিভাইস উপযুক্ত নয়; চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্যবহার করাই নিরাপদ।
নাক ডাকা বা ঘুমে শ্বাস বন্ধ হওয়ার লক্ষণ থাকলে সতর্কতা
ব্রুকসিজমের পাশাপাশি যদি জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, দম বন্ধ হওয়ার মতো অনুভূতি, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। এসব লক্ষণ ঘুমের শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ডেন্টিস্টের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের মাধ্যমে ঘুমের সমস্যাটিও মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
সচেতন থাকুন, কারণ শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়া সহজ
ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষার অভ্যাস অনেক সময় নীরবে চলতে থাকে। ফলে ব্যক্তি নিজে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও দাঁতের ক্ষয় বা চোয়ালের ব্যথার মাধ্যমে পরে সমস্যাটি প্রকাশ পেতে পারে।
তাই নিয়মিত সকালে চোয়ালে ব্যথা বা মাথাব্যথা, দাঁতে শিরশির, দাঁতের আকৃতির পরিবর্তন কিংবা ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষার অভিযোগ থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যভিত্তিক। ব্যক্তিভেদে ব্রুকসিজমের কারণ ও চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে। তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকলে যোগ্য চিকিৎসক বা দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

লাইফস্টাইল ডেস্ক 








