উৎসব মানেই আনন্দ, প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের প্রস্তুতি। ঈদ, পূজা কিংবা অন্য কোনো উৎসবকে কেন্দ্র করে পোশাক ও সাজসজ্জার পাশাপাশি ত্বকের যত্ন নিয়েও অনেকের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ দেখা যায়। তবে দীর্ঘ সময় মেকআপ ব্যবহার, বায়ুদূষণ, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে ত্বক অনেক সময় শুষ্ক, ক্লান্ত ও নিষ্প্রাণ দেখাতে পারে। তাই উৎসবের আগে ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ও সুস্থতা বজায় রাখতে বাহ্যিক পরিচর্যার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের সুস্থতা শুধু প্রসাধনী বা স্কিনকেয়ার পণ্যের ওপর নির্ভর করে না। শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত পানি পান, সঠিক ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। এ ক্ষেত্রে ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার হতে পারে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ত্বকের যত্নে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল
ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও সুস্থতা বজায় রাখতে ভিটামিন সি গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। এটি কোলাজেন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কোলাজেন ত্বকের গঠন ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি ভিটামিন সি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে।
কমলা, লেবু, আমলকি, পেয়ারা, পেঁপে ও অন্যান্য ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এসব ফল শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা করে এবং ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতীয় পুষ্টিবিদ লাভনিট বাত্রা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে কমলা, লেবু, আমলকি ও পেয়ারা খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শুধু একটি নির্দিষ্ট ফল খেলে ত্বক রাতারাতি উজ্জ্বল হয়ে উঠবে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং নিয়মিত সুষম খাদ্যাভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর চর্বি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়ক
ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখতে স্বাস্থ্যকর চর্বির প্রয়োজন রয়েছে। খাদ্যতালিকায় উপকারী চর্বির ঘাটতি থাকলে সামগ্রিক পুষ্টির ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে।
অ্যাভোকাডো, কাঠবাদাম, আখরোট ও অন্যান্য বাদামে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি শরীরের জন্য উপকারী। এসব খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার পাশাপাশি ত্বকের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া সামুদ্রিক চর্বিযুক্ত মাছ, তিসি বীজ ও চিয়া বীজে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। এই উপাদান শরীরের স্বাভাবিক প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। তবে ত্বকের লালচে ভাব, জ্বালাপোড়া বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ক্ষেত্রে শুধু খাবারের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ত্বকের কোষের স্বাভাবিক গঠনে প্রয়োজন প্রোটিন
শরীরের কোষের গঠন, বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য। ত্বকসহ শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতেও প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, দুধ, দই, পনির, ডাল, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার প্রোটিনের ভালো উৎস। যাঁরা নিরামিষ খাবার খান, তাঁরা ডাল, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের শিমজাতীয় খাবার, বাদাম ও বীজ থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন গ্রহণ করতে পারেন।
উৎসবের ব্যস্ততায় অনেক সময় নিয়মিত খাবার খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আসে। শুধু মিষ্টি, ভাজাপোড়া কিংবা হালকা নাশতার ওপর নির্ভর না করে প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিনের উৎস রাখা উচিত। এতে শরীরের পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়।
আয়রন ও জিঙ্কের ঘাটতি এড়াতে সচেতনতা
ত্বক ও শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য আয়রন ও জিঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, জিঙ্ক কোষের বৃদ্ধি, ক্ষত নিরাময় এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।
পালংশাক, ডাল, ছোলা, বিভিন্ন বীজ, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থেকে এসব খনিজ পাওয়া যেতে পারে। কুমড়ার বীজ ও তিল জিঙ্কের উৎস হিসেবে পরিচিত। পালংশাক ও ডালেও আয়রন থাকে, যদিও উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীরে শোষিত হওয়ার হার তুলনামূলক কম হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার সঙ্গে খেলে আয়রন শোষণে সহায়তা পাওয়া যায়।
তবে ত্বকের সমস্যা হলেই আয়রন বা জিঙ্কের ঘাটতি রয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন ছাড়া এসব খনিজের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া ভালো।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার রাখুন প্রতিদিনের তালিকায়
শরীরে তৈরি হওয়া ফ্রি র্যাডিক্যাল কোষের ক্ষতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এসব ক্ষতিকর অণুর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। তাই বৈচিত্র্যময় ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
বেরি জাতীয় ফল, ডালিম, আঙুর, বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, গ্রিন টি এবং কোকোসমৃদ্ধ খাবারে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। ডার্ক চকলেট বা ডার্ক কোকো গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
প্রতিদিন একই ধরনের খাবার না খেয়ে বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি খাদ্যতালিকায় রাখলে নানা ধরনের ভিটামিন, খনিজ ও উদ্ভিজ্জ উপাদান পাওয়া সহজ হয়। তবে কোনো একটি খাবারকে ত্বক উজ্জ্বল করার নিশ্চিত উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
পর্যাপ্ত পানি পান কেন জরুরি
শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে শারীরিক অস্বস্তির পাশাপাশি ত্বকও শুষ্ক দেখাতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে। তবে অতিরিক্ত পানি পান করলেই ত্বক বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর পানির চাহিদা নির্ভর করে। গরম আবহাওয়ায় কিংবা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে পানির প্রয়োজন বাড়তে পারে। তাই তৃষ্ণা, দৈনন্দিন কাজকর্ম ও শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করা উচিত। যাঁদের চিকিৎসকের নির্দেশে পানি গ্রহণ সীমিত রাখতে হয়, তাঁদের সেই নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খাওয়ার ক্ষেত্রে রাখুন ভারসাম্য
উৎসবের সময় মিষ্টি, কেক, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া ও নানা ধরনের মুখরোচক খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এসব খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত গ্রহণের পরিবর্তে পরিমিতি বজায় রাখা ভালো।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, পূর্ণ শস্য এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির ভারসাম্য থাকা জরুরি। ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই-সমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। বাদাম ও বীজ ভিটামিন ই-এর ভালো উৎস; বিভিন্ন ফল ও সবজি অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।
সুষম খাবার শুধু ত্বকের জন্য নয়, শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতেও সহায়ক।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ত্বকের যত্নে খাবারের পাশাপাশি ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, ত্বকের নিস্তেজ ভাব এবং সামগ্রিক অবসাদ বেশি দৃশ্যমান হতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা উপকারী। নিয়মিত ঘুমানোর সময় নির্ধারণ, ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
এ ছাড়া হাঁটাহাঁটি, হালকা ব্যায়াম, যোগব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন কিংবা মেডিটেশন মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। মানসিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ত্বকের সমস্যা বাড়তে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উৎসবের আগে নতুন স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহারে সতর্কতা
উৎসবের আগে দ্রুত ত্বক উজ্জ্বল করার আশায় অনেকে নতুন ক্রিম, সিরাম, ফেসপ্যাক কিংবা প্রসাধনী ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু অপরিচিত কোনো পণ্য থেকে কারও কারও ত্বকে অ্যালার্জি, জ্বালাপোড়া, চুলকানি বা লালচে ভাব দেখা দিতে পারে।
তাই গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠান বা উৎসবের ঠিক আগে নতুন পণ্য ব্যবহার শুরু না করাই সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত। পরিচিত ও ত্বকের উপযোগী পণ্য ব্যবহার করা, মেকআপের আগে উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন প্রয়োগ করা এবং ঘুমানোর আগে মেকআপ ভালোভাবে তুলে ফেলার অভ্যাস বজায় রাখা উচিত।
নতুন পণ্য ব্যবহারের আগে নির্দেশনা মেনে ত্বকের ছোট একটি স্থানে পরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে এতে অ্যালার্জির ঝুঁকি পুরোপুরি বাদ যায় না। তীব্র জ্বালাপোড়া, ফোলাভাব বা স্থায়ী র্যাশ দেখা দিলে পণ্যটি ব্যবহার বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ত্বকের সুস্থতায় প্রয়োজন নিয়মিত অভ্যাস
উৎসবের আগে ত্বকের যত্ন নেওয়ার জন্য ব্যয়বহুল প্রসাধনী বা বিশেষ কোনো খাবারের ওপর নির্ভর করার চেয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি, সঠিক ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ত্বকের উপযোগী পরিচর্যা একসঙ্গে ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ত্বকের ধরন, বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, হরমোন, পরিবেশ ও শারীরিক অবস্থার কারণে ত্বকের চেহারায় পার্থক্য দেখা যায়। তাই রাতারাতি ত্বক বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিমূলক পদ্ধতির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ পরিচর্যায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
উৎসবের আনন্দে নিজেকে সতেজ রাখতে আজ থেকেই খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য আনুন। বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি শরীরের ভেতরের সুস্থতার দিকেও নজর দিন—কারণ সুস্থ জীবনযাপনই সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসী থাকার অন্যতম ভিত্তি।
সূত্র: এনডিটিভি

লাইফ স্টাইল 








