ঢাকা , রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ
কুমিল্লায় কিশোরী জান্নাতুল তাজমীন হত্যা: আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক প্রথম রানেই ব্যাট তুলে উদযাপন, চার শূন্যের চাপ কাটিয়ে লিটনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার বিতর্ক পেছনে ফেলে আল নাসরের জার্সিতে ফিরেই গোল, রোনালদোর ক্যারিয়ারে ৯৮০তম মাইলফলক মুকেশ আম্বানিকে ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী’ বলে কটাক্ষ ইলন মাস্কের, স্টারলিংক নিয়ে নতুন বিতর্ক সাভারে ডিবি পুলিশের অভিযান: ১৩০ পিস ইয়াবাসহ দুইজন গ্রেপ্তার জুমার দিন দুই খুতবার মাঝে যেসব দোয়া পড়বেন কক্সবাজারে হোটেলকক্ষে কুলসুমা হত্যা: সাত দিন পর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অভিযুক্ত ইরফান গ্রেফতার রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ১০ ধরনের খাবার, সুস্থ থাকতে রাখুন প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় উৎসবের আগে ত্বক উজ্জ্বল ও সতেজ রাখতে খাদ্যতালিকায় রাখুন যেসব খাবার
তীব্র মাথাব্যথা, বমি, মাথা ঘোরা ও আলো-শব্দে অস্বস্তি—মাইগ্রেনের কারণ, পর্যায়, ট্রিগার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জানুন।

মাইগ্রেন কেন হয়, কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়

মাথার ভেতর তীব্র ব্যথা থেকে বমি, মাথা ঘোরা ও ক্লান্তি—জেনে নিন মাইগ্রেনের কারণ, লক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়

অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকা, আলো ও শব্দ এড়িয়ে চলা কিংবা মাথার ভেতর তীব্র চাপ ও ব্যথা সহ্য করা—মাইগ্রেনে আক্রান্ত মানুষের কাছে এসব অভিজ্ঞতা অনেকটাই পরিচিত। অনেকের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে স্বাভাবিক কাজকর্ম, চাকরি, পারিবারিক জীবন এমনকি মানসিক সুস্থতাও ব্যাহত হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ মাইগ্রেনে আক্রান্ত। নারীদের মধ্যে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেন হওয়ার প্রবণতা প্রায় তিন গুণ বেশি।

তবে মাইগ্রেন কেবল সাধারণ মাথাব্যথা নয়। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল স্নায়ুবিষয়ক অবস্থা। বংশগত প্রবণতার পাশাপাশি হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের অনিয়ম, মানসিক চাপ, পানিশূন্যতা, খাবারের দীর্ঘ বিরতি এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন বিষয় মাইগ্রেনের আক্রমণকে উসকে দিতে পারে।

মাইগ্রেন আসলে কী?

মাইগ্রেনকে একটি স্নায়ুবিষয়ক অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যাদের মাইগ্রেনের জিনগত প্রবণতা রয়েছে, তাদের মস্তিষ্ক কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন ও উদ্দীপকের প্রতি তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল হতে পারে।

কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা থাকলেও জীবনে কখনো উল্লেখযোগ্য মাইগ্রেনের আক্রমণ নাও হতে পারে। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্দীপক একসঙ্গে কাজ করে মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু করতে পারে।

মাইগ্রেনের সময় শুধু মাথাব্যথাই হয় না। আক্রান্ত ব্যক্তির বমি বমি ভাব, বমি, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, আলো ও শব্দে অস্বস্তি এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা বা ‘ব্রেন ফগ’ও হতে পারে।

একেকজনের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের লক্ষণ একেক রকম হতে পারে। এমনকি একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও জীবনের বিভিন্ন সময়ে লক্ষণের ধরন ও তীব্রতা পরিবর্তিত হতে পারে।

কেন মাইগ্রেনের আক্রমণ হয়?

মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি মাত্র কারণকে দায়ী করা যায় না। বরং একাধিক ছোট ছোট পরিবর্তন একসঙ্গে মস্তিষ্কের সহনসীমা অতিক্রম করলে আক্রমণ শুরু হতে পারে।

সম্ভাব্য উদ্দীপকের মধ্যে রয়েছে—

  • ঘুম কম হওয়া বা অতিরিক্ত ঘুম
  • ঘুমের সময়সূচির পরিবর্তন
  • দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা
  • রক্তে শর্করার মাত্রার ওঠানামা
  • পর্যাপ্ত পানি না পান করা
  • মানসিক চাপ
  • দীর্ঘ সময়ের চাপের পর হঠাৎ বিশ্রামে যাওয়া
  • হরমোনের পরিবর্তন
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি
  • আবহাওয়া ও তাপমাত্রার পরিবর্তন
  • বায়ুচাপ বা আর্দ্রতার পরিবর্তন
  • কিছু নির্দিষ্ট খাবার বা পানীয়
  • অতিরিক্ত আলো, শব্দ বা অন্যান্য সংবেদনশীল উদ্দীপক

তবে সব মানুষের জন্য একই ‘ট্রিগার’ কাজ করে না। যে বিষয়টি একজনের মাইগ্রেন বাড়ায়, অন্যজনের ক্ষেত্রে সেটি কোনো সমস্যাই নাও তৈরি করতে পারে।

নারীদের মাইগ্রেন বেশি হওয়ার কারণ কী?

মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির পর নারীদের মধ্যে মাইগ্রেনের প্রবণতা বাড়তে পারে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো হরমোনের ওঠানামা। মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে ইস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রার পরিবর্তন মাইগ্রেনের আক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

অনেক নারীর ক্ষেত্রে মাসিক শুরু হওয়ার আগের সময়টিতে মাইগ্রেন বেশি তীব্র হতে পারে। আবার পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের আগের পরিবর্তনকালেও হরমোনের ওঠানামার কারণে মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।

এই সময় ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ এবং পারিবারিক বা কর্মজীবনের বাড়তি দায়িত্বও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

মেনোপজের পর অনেক নারীর ক্ষেত্রে হরমোনের মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল হলে মাইগ্রেনের আক্রমণ কমে আসতে পারে। তবে সবার অভিজ্ঞতা একই নয়।

শিশুদেরও হতে পারে মাইগ্রেন

মাইগ্রেন শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা নয়। শিশুদের মধ্যেও এটি দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের মধ্যেই মাইগ্রেনের প্রবণতা প্রায় সমান হতে পারে।

তবে বয়ঃসন্ধির পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয় এবং মেয়েদের মধ্যে মাইগ্রেনের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

শিশুরা অনেক সময় মাথাব্যথার ধরন স্পষ্ট করে বলতে পারে না। তাই বারবার মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, আলো বা শব্দ সহ্য করতে না পারা কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা গেলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

মাইগ্রেনের চারটি পর্যায়

মাইগ্রেনের আক্রমণ অনেক সময় কয়েকটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায় দেখা যায় না।

১. পূর্বাভাস বা প্রোড্রোম পর্যায়

মাথাব্যথা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা বা কখনো আরও আগে শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

যেমন—

  • বারবার হাই তোলা
  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি
  • ঘাড়ে অস্বস্তি বা ব্যথা
  • মেজাজের পরিবর্তন
  • মনোযোগে সমস্যা

এসব লক্ষণ অনেকের ক্ষেত্রে আসন্ন মাইগ্রেনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা দিতে পারে।

২. অরা পর্যায়

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথাব্যথার আগে বা মাথাব্যথার সময় ‘অরা’ দেখা যায়। এতে চোখের সামনে জিগজ্যাগ রেখা, ঝলকানি, আলো বা দৃষ্টির কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

অরা সাধারণত এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। তবে দৃষ্টির পরিবর্তনের পাশাপাশি শরীরের অন্য অংশে অনুভূতির পরিবর্তন বা কথা বলায় সমস্যা হতে পারে।

৩. মাথাব্যথার পর্যায়

এ পর্যায়টি মাইগ্রেনের সবচেয়ে পরিচিত অংশ। মাথার এক পাশে বা উভয় পাশে তীব্র ব্যথা হতে পারে। ব্যথার সঙ্গে আলো ও শব্দে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে এই পর্যায় কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে পারে।

৪. পোস্ট-ড্রোম বা পরবর্তী পর্যায়

মাথাব্যথা কমে যাওয়ার পরও শরীর পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় নিতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি প্রচণ্ড ক্লান্তি, দুর্বলতা, মনোযোগের সমস্যা বা শরীর ভারী লাগার মতো অনুভূতি পেতে পারেন।

অনেকেই এই সময়কে মাইগ্রেনের পরের ‘হ্যাংওভার’ পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন।

কোন কোন স্বাস্থ্য সমস্যা মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে?

কিছু শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন শরীরে আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা সিলিয়াক রোগের মতো কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা।

সিলিয়াক রোগ হলো একটি অটোইমিউন অবস্থা, যেখানে গ্লুটেনের প্রতি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ক্ষুদ্রান্ত্রে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তবে মাথাব্যথা হলেই এসব রোগ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বারবার বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের ভূমিকা

মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিজের শরীরের ধরন ও সম্ভাব্য ট্রিগার সম্পর্কে জানা।

চিকিৎসকেরা অনেক সময় রোগীদের নিয়মিত জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে বলেন।

নিয়মিত খাবার খান

দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা মাইগ্রেনের আক্রমণ বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

পানিশূন্যতাও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া বা ব্যায়ামের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমের সময় ঠিক রাখুন

প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস তৈরি করা উপকারী হতে পারে। খুব কম ঘুমের পাশাপাশি অতিরিক্ত ঘুম বা ঘুমের সময়সূচিতে হঠাৎ পরিবর্তনও কারও কারও ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়াতে পারে।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মাইগ্রেনের অন্যতম সম্ভাব্য উদ্দীপক। আবার দীর্ঘ চাপের পর হঠাৎ বিশ্রামের সময়ও কারও কারও মাইগ্রেন শুরু হতে পারে।

তাই নিয়মিত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা ও নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

মাইগ্রেন ডায়েরি রাখতে পারেন

কোন পরিস্থিতিতে মাইগ্রেন শুরু হচ্ছে তা বোঝার জন্য একটি ‘মাইগ্রেন ডায়েরি’ রাখা যেতে পারে।

আক্রমণের আগে গত এক বা দুই দিনে কী ঘটেছিল, তা লিখে রাখা যেতে পারে। যেমন—

  • কখন ঘুমিয়েছেন
  • কত ঘণ্টা ঘুম হয়েছে
  • কখন খাবার খেয়েছেন
  • পানি কতটা পান করেছেন
  • মানসিক চাপ ছিল কি না
  • আবহাওয়া কেমন ছিল
  • মাসিক চক্রের কোন সময় ছিল
  • কী ধরনের ব্যায়াম করেছেন
  • কী কী উপসর্গ দেখা দিয়েছে

কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে ব্যক্তিগত ট্রিগার শনাক্ত করতে সুবিধা হতে পারে।

তবে মাইগ্রেনের সম্ভাব্য ট্রিগার এড়াতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক খাবার বাদ দেওয়া বা জীবনযাত্রাকে অতিরিক্ত সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।

মাইগ্রেনের সময় ওষুধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হলে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। তবে কোন ওষুধ কার জন্য নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা।

সাধারণ ব্যথানাশক হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিন ব্যবহার করা হয়। বমি বমি ভাব বা বমির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে অন্য ওষুধও ব্যবহার করা যেতে পারে।

মাইগ্রেনের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহৃত ‘ট্রিপটান’ শ্রেণির ওষুধও রয়েছে, যা চিকিৎসকের পরামর্শে দেওয়া হতে পারে।

তবে ঘন ঘন ব্যথানাশক গ্রহণ করাও বিপজ্জনক হতে পারে এবং অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারের কারণে উল্টো মাথাব্যথা বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত বা ঘন ঘন মাইগ্রেন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সবসময় কি কফি বা চকলেট বাদ দিতে হবে?

মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে কফি, চকলেটসহ বিভিন্ন খাবারকে সম্ভাব্য ট্রিগার হিসেবে বলা হয়। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে একই খাবার সমস্যা তৈরি করে না।

তাই কোনো খাবার খাওয়ার পর নিয়মিত মাইগ্রেনের আক্রমণ হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রমাণ ছাড়া একসঙ্গে অনেক ধরনের খাবার বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল জীবনযাপন।

ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২ কি উপকারী?

কিছু গবেষণায় ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২সহ কিছু সাপ্লিমেন্ট মাইগ্রেনের আক্রমণের সংখ্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে সাপ্লিমেন্ট মানেই সবার জন্য নিরাপদ বা প্রয়োজনীয়—এমন নয়। বিশেষ করে অন্য কোনো রোগ থাকলে বা নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিও রয়েছে

মাইগ্রেন সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গত কয়েক বছরে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত সিজিআরপি নামের একটি নিউরোপেপটাইড বা সংকেত-ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে কিছু আধুনিক প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা তৈরি হয়েছে।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বোটুলিনাম টক্সিন বা বোটক্সও দীর্ঘস্থায়ী মাইগ্রেন প্রতিরোধে চিকিৎসকেরা ব্যবহার করেন।

এ ছাড়া কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আকুপাংচার, যোগব্যায়াম, তাই চি, শিথিলায়ন অনুশীলন ও অন্যান্য সহায়ক পদ্ধতি উপকার করতে পারে।

তবে এসব পদ্ধতির কার্যকারিতা ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে আলাদা হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা উচিত।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের ধরন হঠাৎ বদলে গেলে, জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা অনুভূত হলে অথবা মাথাব্যথার সঙ্গে গুরুতর অন্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথার সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে সমস্যা, দৃষ্টিশক্তির গুরুতর পরিবর্তন, জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

বারবার মাইগ্রেন হলে নিজের মতো করে দীর্ঘদিন ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

শেষ কথা

মাইগ্রেন অনেকের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে। তবে মাইগ্রেন মানেই সারাজীবন অসহ্য ব্যথা সহ্য করতে হবে—এমন নয়।

নিজের সম্ভাব্য ট্রিগার চিহ্নিত করা, নিয়মিত ঘুম ও খাবারের অভ্যাস বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে অনেকের মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যাটিকে অবহেলা না করা। বারবার মাইগ্রেন হলে সঠিক রোগনির্ণয় ও ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসায় মাইগ্রেন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক পদ্ধতি রয়েছে—তাই দীর্ঘদিন সমস্যায় ভুগলেও চিকিৎসা নেওয়ার আশা হারানোর কারণ নেই।

কুমিল্লায় কিশোরী জান্নাতুল তাজমীন হত্যা: আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক

তীব্র মাথাব্যথা, বমি, মাথা ঘোরা ও আলো-শব্দে অস্বস্তি—মাইগ্রেনের কারণ, পর্যায়, ট্রিগার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জানুন।

মাইগ্রেন কেন হয়, কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়

আপডেট সময়: ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাথার ভেতর তীব্র ব্যথা থেকে বমি, মাথা ঘোরা ও ক্লান্তি—জেনে নিন মাইগ্রেনের কারণ, লক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়

অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকা, আলো ও শব্দ এড়িয়ে চলা কিংবা মাথার ভেতর তীব্র চাপ ও ব্যথা সহ্য করা—মাইগ্রেনে আক্রান্ত মানুষের কাছে এসব অভিজ্ঞতা অনেকটাই পরিচিত। অনেকের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে স্বাভাবিক কাজকর্ম, চাকরি, পারিবারিক জীবন এমনকি মানসিক সুস্থতাও ব্যাহত হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ মাইগ্রেনে আক্রান্ত। নারীদের মধ্যে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেন হওয়ার প্রবণতা প্রায় তিন গুণ বেশি।

তবে মাইগ্রেন কেবল সাধারণ মাথাব্যথা নয়। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল স্নায়ুবিষয়ক অবস্থা। বংশগত প্রবণতার পাশাপাশি হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের অনিয়ম, মানসিক চাপ, পানিশূন্যতা, খাবারের দীর্ঘ বিরতি এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন বিষয় মাইগ্রেনের আক্রমণকে উসকে দিতে পারে।

মাইগ্রেন আসলে কী?

মাইগ্রেনকে একটি স্নায়ুবিষয়ক অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যাদের মাইগ্রেনের জিনগত প্রবণতা রয়েছে, তাদের মস্তিষ্ক কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন ও উদ্দীপকের প্রতি তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল হতে পারে।

কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা থাকলেও জীবনে কখনো উল্লেখযোগ্য মাইগ্রেনের আক্রমণ নাও হতে পারে। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্দীপক একসঙ্গে কাজ করে মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু করতে পারে।

মাইগ্রেনের সময় শুধু মাথাব্যথাই হয় না। আক্রান্ত ব্যক্তির বমি বমি ভাব, বমি, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, আলো ও শব্দে অস্বস্তি এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা বা ‘ব্রেন ফগ’ও হতে পারে।

একেকজনের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের লক্ষণ একেক রকম হতে পারে। এমনকি একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও জীবনের বিভিন্ন সময়ে লক্ষণের ধরন ও তীব্রতা পরিবর্তিত হতে পারে।

কেন মাইগ্রেনের আক্রমণ হয়?

মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি মাত্র কারণকে দায়ী করা যায় না। বরং একাধিক ছোট ছোট পরিবর্তন একসঙ্গে মস্তিষ্কের সহনসীমা অতিক্রম করলে আক্রমণ শুরু হতে পারে।

সম্ভাব্য উদ্দীপকের মধ্যে রয়েছে—

  • ঘুম কম হওয়া বা অতিরিক্ত ঘুম
  • ঘুমের সময়সূচির পরিবর্তন
  • দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা
  • রক্তে শর্করার মাত্রার ওঠানামা
  • পর্যাপ্ত পানি না পান করা
  • মানসিক চাপ
  • দীর্ঘ সময়ের চাপের পর হঠাৎ বিশ্রামে যাওয়া
  • হরমোনের পরিবর্তন
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি
  • আবহাওয়া ও তাপমাত্রার পরিবর্তন
  • বায়ুচাপ বা আর্দ্রতার পরিবর্তন
  • কিছু নির্দিষ্ট খাবার বা পানীয়
  • অতিরিক্ত আলো, শব্দ বা অন্যান্য সংবেদনশীল উদ্দীপক

তবে সব মানুষের জন্য একই ‘ট্রিগার’ কাজ করে না। যে বিষয়টি একজনের মাইগ্রেন বাড়ায়, অন্যজনের ক্ষেত্রে সেটি কোনো সমস্যাই নাও তৈরি করতে পারে।

নারীদের মাইগ্রেন বেশি হওয়ার কারণ কী?

মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির পর নারীদের মধ্যে মাইগ্রেনের প্রবণতা বাড়তে পারে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো হরমোনের ওঠানামা। মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে ইস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রার পরিবর্তন মাইগ্রেনের আক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

✒️ আরও পড়ুন 📖  সকালে লেবুপানি পানের উপকারিতা

অনেক নারীর ক্ষেত্রে মাসিক শুরু হওয়ার আগের সময়টিতে মাইগ্রেন বেশি তীব্র হতে পারে। আবার পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের আগের পরিবর্তনকালেও হরমোনের ওঠানামার কারণে মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।

এই সময় ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ এবং পারিবারিক বা কর্মজীবনের বাড়তি দায়িত্বও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

মেনোপজের পর অনেক নারীর ক্ষেত্রে হরমোনের মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল হলে মাইগ্রেনের আক্রমণ কমে আসতে পারে। তবে সবার অভিজ্ঞতা একই নয়।

শিশুদেরও হতে পারে মাইগ্রেন

মাইগ্রেন শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা নয়। শিশুদের মধ্যেও এটি দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের মধ্যেই মাইগ্রেনের প্রবণতা প্রায় সমান হতে পারে।

তবে বয়ঃসন্ধির পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয় এবং মেয়েদের মধ্যে মাইগ্রেনের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

শিশুরা অনেক সময় মাথাব্যথার ধরন স্পষ্ট করে বলতে পারে না। তাই বারবার মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, আলো বা শব্দ সহ্য করতে না পারা কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা গেলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

মাইগ্রেনের চারটি পর্যায়

মাইগ্রেনের আক্রমণ অনেক সময় কয়েকটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায় দেখা যায় না।

১. পূর্বাভাস বা প্রোড্রোম পর্যায়

মাথাব্যথা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা বা কখনো আরও আগে শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

যেমন—

  • বারবার হাই তোলা
  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি
  • ঘাড়ে অস্বস্তি বা ব্যথা
  • মেজাজের পরিবর্তন
  • মনোযোগে সমস্যা

এসব লক্ষণ অনেকের ক্ষেত্রে আসন্ন মাইগ্রেনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা দিতে পারে।

২. অরা পর্যায়

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথাব্যথার আগে বা মাথাব্যথার সময় ‘অরা’ দেখা যায়। এতে চোখের সামনে জিগজ্যাগ রেখা, ঝলকানি, আলো বা দৃষ্টির কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

অরা সাধারণত এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। তবে দৃষ্টির পরিবর্তনের পাশাপাশি শরীরের অন্য অংশে অনুভূতির পরিবর্তন বা কথা বলায় সমস্যা হতে পারে।

৩. মাথাব্যথার পর্যায়

এ পর্যায়টি মাইগ্রেনের সবচেয়ে পরিচিত অংশ। মাথার এক পাশে বা উভয় পাশে তীব্র ব্যথা হতে পারে। ব্যথার সঙ্গে আলো ও শব্দে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে এই পর্যায় কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে পারে।

৪. পোস্ট-ড্রোম বা পরবর্তী পর্যায়

মাথাব্যথা কমে যাওয়ার পরও শরীর পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় নিতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি প্রচণ্ড ক্লান্তি, দুর্বলতা, মনোযোগের সমস্যা বা শরীর ভারী লাগার মতো অনুভূতি পেতে পারেন।

অনেকেই এই সময়কে মাইগ্রেনের পরের ‘হ্যাংওভার’ পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন।

কোন কোন স্বাস্থ্য সমস্যা মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে?

কিছু শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন শরীরে আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা সিলিয়াক রোগের মতো কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা।

✒️ আরও পড়ুন 📖  অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের বিপদ: ৫টি লক্ষণ দেখলে সতর্ক হোন

সিলিয়াক রোগ হলো একটি অটোইমিউন অবস্থা, যেখানে গ্লুটেনের প্রতি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ক্ষুদ্রান্ত্রে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তবে মাথাব্যথা হলেই এসব রোগ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বারবার বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের ভূমিকা

মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিজের শরীরের ধরন ও সম্ভাব্য ট্রিগার সম্পর্কে জানা।

চিকিৎসকেরা অনেক সময় রোগীদের নিয়মিত জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে বলেন।

নিয়মিত খাবার খান

দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা মাইগ্রেনের আক্রমণ বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

পানিশূন্যতাও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া বা ব্যায়ামের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমের সময় ঠিক রাখুন

প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস তৈরি করা উপকারী হতে পারে। খুব কম ঘুমের পাশাপাশি অতিরিক্ত ঘুম বা ঘুমের সময়সূচিতে হঠাৎ পরিবর্তনও কারও কারও ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়াতে পারে।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মাইগ্রেনের অন্যতম সম্ভাব্য উদ্দীপক। আবার দীর্ঘ চাপের পর হঠাৎ বিশ্রামের সময়ও কারও কারও মাইগ্রেন শুরু হতে পারে।

তাই নিয়মিত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা ও নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

মাইগ্রেন ডায়েরি রাখতে পারেন

কোন পরিস্থিতিতে মাইগ্রেন শুরু হচ্ছে তা বোঝার জন্য একটি ‘মাইগ্রেন ডায়েরি’ রাখা যেতে পারে।

আক্রমণের আগে গত এক বা দুই দিনে কী ঘটেছিল, তা লিখে রাখা যেতে পারে। যেমন—

  • কখন ঘুমিয়েছেন
  • কত ঘণ্টা ঘুম হয়েছে
  • কখন খাবার খেয়েছেন
  • পানি কতটা পান করেছেন
  • মানসিক চাপ ছিল কি না
  • আবহাওয়া কেমন ছিল
  • মাসিক চক্রের কোন সময় ছিল
  • কী ধরনের ব্যায়াম করেছেন
  • কী কী উপসর্গ দেখা দিয়েছে

কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে ব্যক্তিগত ট্রিগার শনাক্ত করতে সুবিধা হতে পারে।

তবে মাইগ্রেনের সম্ভাব্য ট্রিগার এড়াতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক খাবার বাদ দেওয়া বা জীবনযাত্রাকে অতিরিক্ত সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।

মাইগ্রেনের সময় ওষুধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হলে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। তবে কোন ওষুধ কার জন্য নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা।

সাধারণ ব্যথানাশক হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিন ব্যবহার করা হয়। বমি বমি ভাব বা বমির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে অন্য ওষুধও ব্যবহার করা যেতে পারে।

মাইগ্রেনের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহৃত ‘ট্রিপটান’ শ্রেণির ওষুধও রয়েছে, যা চিকিৎসকের পরামর্শে দেওয়া হতে পারে।

তবে ঘন ঘন ব্যথানাশক গ্রহণ করাও বিপজ্জনক হতে পারে এবং অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারের কারণে উল্টো মাথাব্যথা বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত বা ঘন ঘন মাইগ্রেন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

✒️ আরও পড়ুন 📖  সারা বছর সুস্থ থাকতে নিয়মিত খান এই ৭টি খাবার

সবসময় কি কফি বা চকলেট বাদ দিতে হবে?

মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে কফি, চকলেটসহ বিভিন্ন খাবারকে সম্ভাব্য ট্রিগার হিসেবে বলা হয়। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে একই খাবার সমস্যা তৈরি করে না।

তাই কোনো খাবার খাওয়ার পর নিয়মিত মাইগ্রেনের আক্রমণ হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রমাণ ছাড়া একসঙ্গে অনেক ধরনের খাবার বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল জীবনযাপন।

ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২ কি উপকারী?

কিছু গবেষণায় ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২সহ কিছু সাপ্লিমেন্ট মাইগ্রেনের আক্রমণের সংখ্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে সাপ্লিমেন্ট মানেই সবার জন্য নিরাপদ বা প্রয়োজনীয়—এমন নয়। বিশেষ করে অন্য কোনো রোগ থাকলে বা নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিও রয়েছে

মাইগ্রেন সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গত কয়েক বছরে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত সিজিআরপি নামের একটি নিউরোপেপটাইড বা সংকেত-ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে কিছু আধুনিক প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা তৈরি হয়েছে।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বোটুলিনাম টক্সিন বা বোটক্সও দীর্ঘস্থায়ী মাইগ্রেন প্রতিরোধে চিকিৎসকেরা ব্যবহার করেন।

এ ছাড়া কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আকুপাংচার, যোগব্যায়াম, তাই চি, শিথিলায়ন অনুশীলন ও অন্যান্য সহায়ক পদ্ধতি উপকার করতে পারে।

তবে এসব পদ্ধতির কার্যকারিতা ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে আলাদা হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা উচিত।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের ধরন হঠাৎ বদলে গেলে, জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা অনুভূত হলে অথবা মাথাব্যথার সঙ্গে গুরুতর অন্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথার সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে সমস্যা, দৃষ্টিশক্তির গুরুতর পরিবর্তন, জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

বারবার মাইগ্রেন হলে নিজের মতো করে দীর্ঘদিন ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

শেষ কথা

মাইগ্রেন অনেকের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে। তবে মাইগ্রেন মানেই সারাজীবন অসহ্য ব্যথা সহ্য করতে হবে—এমন নয়।

নিজের সম্ভাব্য ট্রিগার চিহ্নিত করা, নিয়মিত ঘুম ও খাবারের অভ্যাস বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে অনেকের মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যাটিকে অবহেলা না করা। বারবার মাইগ্রেন হলে সঠিক রোগনির্ণয় ও ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসায় মাইগ্রেন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক পদ্ধতি রয়েছে—তাই দীর্ঘদিন সমস্যায় ভুগলেও চিকিৎসা নেওয়ার আশা হারানোর কারণ নেই।