বলিউড অভিনেত্রী সেলিনা জেটলি ও তাঁর স্বামী অস্ট্রিয়ার ব্যবসায়ী পিটার হাগের দাম্পত্য বিচ্ছেদ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের সংসারের ইতি টানার সিদ্ধান্তের পর নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন অভিনেত্রী। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে নিজের দাম্পত্য জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা, বিচ্ছেদের আইনি লড়াই এবং চার সন্তানকে ঘিরে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
সেলিনার অভিযোগ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও মানসিক সুস্থতার কথা বিবেচনা করে তিনি স্বামীর কাছে শান্তিপূর্ণভাবে বিবাহবিচ্ছেদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই অনুরোধে সাড়া মেলেনি বলে দাবি অভিনেত্রীর। বরং বিচ্ছেদের আইনি খরচ বহন করতে না পারলে তাঁকে পরিচারিকার কাজ করে অর্থ উপার্জনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
তবে পিটার হাগের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়গুলোকে অভিনেত্রীর উত্থাপিত অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
বিবাহবার্ষিকীর উপহারের বদলে বিচ্ছেদের নোটিস
সেলিনা জেটলির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে তাঁদের বিবাহবার্ষিকীকে ঘিরে তাঁর মনে অন্য রকম প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই সময় উপহারের পরিবর্তে বিচ্ছেদের নোটিস হাতে পান বলে দাবি করেছেন অভিনেত্রী।
সমাজমাধ্যমের পোস্টে নিজের সেই সময়কার মানসিক অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। সেলিনা জানান, একসময় একটি সুটকেস নিয়ে মুম্বইয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল তাঁকে। সেই সুটকেসে ছিল প্রয়োজনীয় কিছু নথিপত্র, প্রয়াত মায়ের শাড়ি এবং দাম্পত্য জীবনের নানা কষ্টের স্মৃতি।
অভিনেত্রীর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতা।
সন্তানদের কথা ভেবে সমঝোতার চেষ্টা
সেলিনার দাবি, বিবাহবিচ্ছেদের মামলার প্রথম শুনানিতে বিচারক তাঁদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর সুযোগ দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত আলোচনার সময়ও দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
অভিনেত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে সন্তানদের কথা বিবেচনা করে স্বামীর কাছে শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি। নিজের দাম্পত্য জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার কথা আদালতে তুলে না ধরার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন বলে দাবি তাঁর।
সেলিনার বক্তব্য, সন্তানদের যেন বাবা-মায়ের বিরোধের মধ্যে পড়তে না হয়, সেই লক্ষ্যেই তিনি সমঝোতার পথ বেছে নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিচ্ছেদ সম্পন্ন হলে সন্তানদের জীবনে অস্থিরতা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।
কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরোধ গড়িয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে।
আইনি খরচ নিয়ে কী অভিযোগ অভিনেত্রীর?
সেলিনা জেটলির পোস্টের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো বিচ্ছেদের মামলা পরিচালনার খরচ নিয়ে তাঁর অভিযোগ।
অভিনেত্রীর দাবি, আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো অর্থ তাঁর হাতে নেই—এ কথা জানানোর পর পিটার হাগ তাঁকে আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। একই সঙ্গে অর্থের অভাব হলে পরিচারিকার কাজ করে উপার্জন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
১৫ বছরের দাম্পত্য এবং চার সন্তান থাকার পর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পর বিচ্ছেদের সময় আর্থিক ও মানসিক চাপ কীভাবে একজন মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এ বিষয়ে স্বামীর বক্তব্য কিংবা আদালতের কোনো পর্যবেক্ষণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হওয়ায় অভিযোগটির সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বিয়ের আগের সম্পত্তি নিয়েও বিরোধের অভিযোগ
দাম্পত্য বিচ্ছেদের পাশাপাশি সম্পত্তি নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন সেলিনা। তাঁর অভিযোগ, বিয়ের আগে তাঁর মালিকানায় থাকা সম্পত্তির ওপরও দাবি জানানো হয়েছিল।
এ ছাড়া সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে তাঁকে অস্ট্রিয়ায় অবস্থান করতে হবে বলে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি অভিনেত্রীর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে বা বন্ধ হয়ে যায়।
চার সন্তানের মা হিসেবে এই পরিস্থিতি তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর বলে জানিয়েছেন সেলিনা। সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং তাদের জীবনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার বিষয়টি তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলেও তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তবে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট আইনি দাবি এবং সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা কী, তা বিস্তারিতভাবে জানা না গেলে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
সন্তানদের প্রভাবিত করার অভিযোগ
সেলিনা জেটলি আরও অভিযোগ করেছেন, সন্তানদের তাঁর বিরুদ্ধে প্রভাবিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ মা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
অভিনেত্রীর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেই প্রভাব ফেলছে না, বরং সন্তানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিচ্ছেদ-পরবর্তী সন্তানদের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ অনেক পরিবারের ক্ষেত্রেই জটিল হয়ে ওঠে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য, আদালতের নির্দেশনা এবং শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। সেলিনার ক্ষেত্রেও যৌথ অভিভাবকত্ব নিয়ে আইনি লড়াই চলমান বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাত ১টায় বাড়ি ছাড়ার দাবি
নিজের পোস্টে বাড়ি ছাড়ার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন সেলিনা। তাঁর দাবি, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অস্ট্রিয়ায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় রাত ১টার দিকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে।
এই ঘটনার সময় বলিউড অভিনেত্রী লারা দত্তও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন বা ঘটনার সাক্ষী ছিলেন বলে দাবি করেছেন সেলিনা।
তবে বাড়ি ছাড়ার ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি এবং লারা দত্তের ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া না গেলে এ বিষয়ে অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত টানা সমীচীন নয়।
অভিনেত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, দাম্পত্য সম্পর্কের অবসানের পাশাপাশি বসবাসের পরিবেশ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আর্থিক সামর্থ্য এবং সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রশ্নগুলোও তাঁর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
যৌথ অভিভাবকত্ব নিয়ে লড়াই অব্যাহত
সেলিনা জেটলি ও পিটার হাগের বিচ্ছেদ-সংক্রান্ত বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁদের চার সন্তানের ভবিষ্যৎ। সন্তানদের দেখাশোনা, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অভিভাবকত্বের অধিকার নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলছে বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।
বিচ্ছেদের মতো পরিস্থিতিতে বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত বিরোধের বাইরে সন্তানদের মানসিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই মামলায় সন্তানদের অভিভাবকত্ব নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
সেলিনা জানিয়েছেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং নিজের অধিকার আদায়ে লড়াই চালিয়ে যেতে চান।
‘আমি ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকব’
দীর্ঘ পোস্টের শেষাংশে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, তিনি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ছাড়তে চান না। সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিজের অধিকার রক্ষার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সেলিনা জেটলির এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর দাম্পত্য বিচ্ছেদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত জীবনের এই বিরোধের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
অভিযোগের বিষয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং আদালতের সিদ্ধান্ত সামনে এলে পুরো বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। আপাতত চার সন্তানকে ঘিরে উদ্বেগ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং যৌথ অভিভাবকত্বের প্রশ্ন—এই তিনটি বিষয়ই সেলিনা জেটলির বিচ্ছেদ-সংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।

বিনোদন ডেস্ক 






