ঢাকার সাভারে প্রায় ২৬ লাখ টাকা ডাকাতি/ছিনতাইয়ের ঘটনায় কথিত ডাকাত চক্রের তিন সদস্যকে মাদারীপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) উত্তর। পুলিশের দাবি, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তদন্তের পর মাদারীপুরের রাজৈর থানাধীন টেকেরহাট এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের একাধিক মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, পুলিশের টিশার্ট, নেমপ্লেট, মানিব্যাগ, হাতঘড়ি, চাবির রিং এবং দেশীয় অস্ত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মো. উজ্জল সরদার (৩২), মো. জুয়েল সিকদার (৩৮) এবং মো. তামিম হাওলাদার (২৫)।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে সাভার মডেল থানাধীন হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ডাকাতি/ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
ঘটনাটি ঘটে মহাসড়কের সাভারমুখী লেনের দক্ষিণ পাশ থেকে উত্তর পাশে যাওয়ার সময়। এ ঘটনায় প্রায় ২৬ লাখ টাকা ডাকাতি বা ছিনতাই হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
ঘটনার পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর সাভার মডেল থানায় মামলা করা হয়। মামলাটি সাভার মডেল থানার মামলা নম্বর-৩৯। এতে দণ্ডবিধির ১৭০/১৭১/৩৯৪ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
মামলার পর ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে তদন্ত শুরু করে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
ঢাকা জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের নির্দেশনায় মামলাটির রহস্য উদঘাটনে ডিবি উত্তর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
তদন্তের সময় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য কৌশলের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ঢাকা জেলা ডিবি উত্তরের অফিসার ইনচার্জ সাইদুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে এসআরবি-নবীনগর ও এসআরবি-মাদারীপুরের সদস্যদের সহযোগিতা নেওয়া হয়।
ডিবির এসআই (নিঃ) মনির হোসেন, এএসআই (নিঃ) মো. আব্দুস সালামসহ সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যরা গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানাধীন টেকেরহাট এলাকায় অভিযান চালান।
সেখান থেকেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—
মো: উজ্জল সরদার (৩২): পিতা খলিল সরদার, স্থায়ী ঠিকানা—আলীপুর গ্রাম, কালকিনি থানা, মাদারীপুর।
মো: জুয়েল সিকদার (৩৮): পিতা মৃত হানিফ সিকদার, স্থায়ী ঠিকানা—কুলপদ্দি গ্রাম, মাদারীপুর সদর মডেল থানা, মাদারীপুর।
মো: তামিম হাওলাদার (২৫): পিতা মজিবর হাওলাদার, স্থায়ী ঠিকানা—খাসেরহাট গ্রাম, কালকিনি থানা, মাদারীপুর।
অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের কথা জানিয়েছে ঢাকা জেলা ডিবি উত্তর।
পুলিশের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে একটি নীল রঙের TVS Apache মোটরসাইকেল, তিনটি Symphony A30 বাটন মোবাইল ফোন, একটি Itel A676L অ্যান্ড্রয়েড ফোন, একটি Itel A6611L অ্যান্ড্রয়েড ফোন, একটি Infinix GT 30, একটি Primo 58 Mini এবং একটি Infinix Hot 60 Pro অ্যান্ড্রয়েড ফোন।
এ ছাড়া বিভিন্ন মূল্যমানের মোট ১৩ হাজার ১৬৭ টাকা, ‘জাহিদুল’ নামের একটি নেমপ্লেট, বিভিন্ন কাগজপত্রসহ তিনটি মানিব্যাগ, দুটি হাতঘড়ি এবং ছয়টি চাবিসহ একটি চাবির রিং উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
উদ্ধার করা অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে একটি নীল রঙের পুলিশের টিশার্ট, একটি লোহার হাসুয়া এবং দুটি লোহার ছুরি।
পুলিশের ভাষ্য, এসব সামগ্রী মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঢাকা জেলা ডিবি পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা প্রাইভেটকার, হাইচ ও নোয়া গাড়ি ব্যবহার করে ঢাকা জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করত। বিভিন্ন বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার তথ্য প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া এসব তথ্যের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আইনগতভাবে অভিযুক্ত বা আসামি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, সিডিএমএস বা অপরাধ-সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার পর্যালোচনা করে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে আগের মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মো. উজ্জল সরদারের বিরুদ্ধে শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট থানায় ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটিতে দণ্ডবিধির ৪৫৭/৩৮০/৫১১ ধারায় অভিযোগ রয়েছে। ওই মামলায় ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে চার্জশিট দেওয়ার তথ্যও পুলিশের নথিতে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে মো. তামিম হাওলাদারের বিরুদ্ধে ঢাকার গুলশান থানায় ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারায় মামলা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই মামলায় ১২ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের তথ্য।
তবে পূর্বের মামলায় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা মানেই বর্তমান মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি নয়। প্রতিটি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তিনজনকে সাভার মডেল থানার মামলা নম্বর-৩৯, তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দণ্ডবিধির ১৭০/১৭১/৩৯৪ ধারার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
মামলার তদন্তের স্বার্থে এবং ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, ডাকাতির অর্থ ও অন্যান্য মালামাল কোথায় রয়েছে এবং চক্রটির অন্যান্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে মনে করছে পুলিশ।
এ কারণে গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
রিমান্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন সংশ্লিষ্ট আদালত।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সাভারের হেমায়েতপুরে সংঘটিত ডাকাতি/ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আরও যাচাই করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে এই চক্রের সঙ্গে আরও কোনো ব্যক্তি জড়িত রয়েছে কি না, তারা দেশের অন্য কোথাও একই ধরনের ঘটনায় জড়িত ছিল কি না এবং বিভিন্ন বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে তারা কীভাবে অপরাধ পরিচালনা করত—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
সাভার মডেল থানায় দায়ের করা মামলাটির তদন্ত বর্তমানে চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানোর পর পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও আলামত যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
নোট: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত ডাকাতি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ পুলিশের বক্তব্য ও মামলার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগতভাবে নির্দোষ বিবেচনা করার নীতি প্রযোজ্য।

বাংলাদেশ খবর ডেস্ক 






