দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হলে অনেকেই শুরুতে সাধারণ জ্বর ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যান। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু দ্রুত গুরুতর রূপ নিতে পারে। তাই জ্বরের সঙ্গে কোন কোন উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং কীভাবে ডেঙ্গু থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা যায়—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির অনেকের উপসর্গ মৃদু হতে পারে, আবার কারও কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। উপসর্গ দেখা দিলে সাধারণত হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায় না; প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ কী?
ডেঙ্গুর সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো জ্বর। এর সঙ্গে থাকতে পারে—
- তীব্র মাথাব্যথা
- চোখের পেছনে ব্যথা
- পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- শরীরে দুর্বলতা ও ক্লান্তি
- ত্বকে লালচে দাগ বা র্যাশ
- কিছু ক্ষেত্রে গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
তবে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না। অনেকের ডেঙ্গু হলেও উপসর্গ খুব সামান্য হতে পারে। তাই জ্বরকে একেবারে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বর হলেই কি ডেঙ্গু?
না। জ্বর হলেই ডেঙ্গু হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ডেঙ্গুর অনেক উপসর্গ অন্যান্য ভাইরাসজনিত অসুস্থতা, চিকুনগুনিয়া বা অন্যান্য রোগের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তাই সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত।
ডেঙ্গু হলে বিশ্রাম জরুরি
ডেঙ্গু শনাক্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শরীরকে অতিরিক্ত পরিশ্রমের মধ্যে না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।
পানিশূন্যতা এড়াতে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করাও জরুরি। পানি, খাবার স্যালাইনসহ উপযুক্ত তরল এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা যেতে পারে। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তরল গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা ভালো।
কোন ওষুধ এড়িয়ে চলবেন?
ডেঙ্গুর জ্বর ও ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়।
তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেনসহ NSAID জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়। এসব ওষুধ ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
জ্বরের সময় শরীর ঠান্ডা রাখতে স্বাভাবিক বা ঠান্ডা পানিতে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া যেতে পারে।
শুধু প্লাটিলেট কমলেই কি বিপদ?
ডেঙ্গু নিয়ে অনেকের মধ্যে প্লাটিলেটের সংখ্যা নিয়ে আতঙ্ক দেখা যায়। কিন্তু রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখাই যথেষ্ট নয়।
রক্তপাত হচ্ছে কি না, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, অতিরিক্ত দুর্বলতা, পেটে ব্যথা, বমি এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
তাই পরীক্ষার রিপোর্টে প্লাটিলেট কম দেখলেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে
ডেঙ্গু কখনো কখনো দ্রুত গুরুতর হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার সময় বা পরবর্তী সময়ে কিছু বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে—
- তীব্র পেটে ব্যথা
- বারবার বা অবিরাম বমি
- নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত
- বমি বা পায়খানায় রক্ত
- দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাসকষ্ট
- অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা
- প্রচণ্ড তৃষ্ণা
- ত্বক ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
- অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা সাড়া কমে যাওয়া
- প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া
এসব লক্ষণ গুরুতর ডেঙ্গুর ইঙ্গিত হতে পারে এবং এ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ডেঙ্গু রোগীকে মশারি ব্যবহার করতে হবে কেন?
ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ালে সেই মশা ভাইরাস বহন করে অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জ্বরের সময় রোগীকে মশারির মধ্যে রাখা, ঘরে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা উচিত।
এডিস মশা কখন বেশি কামড়ায়?
ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে সকাল ও সূর্যাস্তের আগের সময় এ মশার কামড়ের ঝুঁকি বেশি। তবে শুধু নির্দিষ্ট সময়েই মশা কামড়ায়—এমন ধারণা করে দিনের অন্য সময়ে সতর্কতা বাদ দেওয়া উচিত নয়।
কোথায় এডিস মশা জন্মায়?
এডিস মশা অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, বালতি, পুরোনো টায়ার, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন হতে পারে।
তাই বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত নজর দিতে হবে। যেসব পাত্রে পানি জমতে পারে সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে এবং পানি জমার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। WHO ঘরের পানির পাত্র নিয়মিত খালি, পরিষ্কার ও ঢেকে রাখার পরামর্শ দেয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে যা করবেন
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার কামড় এড়িয়ে চলা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা।
এ জন্য—
১. বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে দেবেন না।
২. ফুলের টব, বালতি, টায়ার ও পরিত্যক্ত পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
৩. পানির পাত্র ঢেকে রাখুন।
৪. দিনের বেলাতেও প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি ব্যবহার করুন।
৫. শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরুন।
৬. প্রয়োজন হলে অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন।
৭. বাড়ির ভেতর ও আশপাশে মশার প্রজননস্থল নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের বড় হাতিয়ার
ডেঙ্গুকে শুধু একটি মৌসুমি জ্বর হিসেবে দেখলে চলবে না। জ্বরের সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং গুরুতর সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে মশার কামড় থেকে সুরক্ষা এবং বাড়ি-আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণে নিয়মিত উদ্যোগ নিতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রেও মশার কামড় প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা জরুরি, যাতে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো যায়।
স্বাস্থ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: এই প্রতিবেদন সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্যের জন্য। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে বা রোগীর অবস্থা খারাপ হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

অনলাইন ডেস্ক 








