সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নারী পরিচয়ে বন্ধুত্ব। এরপর ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্ক। একপর্যায়ে সেই সম্পর্ককে বিয়ের রূপ দিয়ে দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর মতো যোগাযোগ। এভাবে এক ইতালি প্রবাসীর কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে তিন লাখ টাকার বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নাটোরের লালপুরের এক তরুণের বিরুদ্ধে।
তবে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রবাসী যাকে ‘সুমাইয়া আক্তার’ নামে একজন নারী হিসেবে জানতেন, বাস্তবে তিনি কোনো নারী নন। পুলিশের দাবি, ওই পরিচয়ের আড়ালে ছিলেন লালপুর উপজেলার গন্ডবিল গ্রামের বাসিন্দা ২০ বছর বয়সী শান্ত আলী।
এ ঘটনায় শান্ত আলী ও তার বাবা শহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযানে প্রতারণায় ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার ৪৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। প্রায় ছয় মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘সুমাইয়া আক্তার’ নামের একটি পরিচয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়।
নারী পরিচয়ে ওই ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত কথাবার্তার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর ওই পরিচয়কে বিশ্বাস করে প্রবাসী ব্যক্তি নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। পরে তাদের সম্পর্ককে বিয়ের রূপ দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় চার মাস আগে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ওই প্রবাসীর সঙ্গে ‘বিয়ে’ সম্পন্ন হয়েছে বলে তাকে বিশ্বাস করানো হয়।
এরপর কথিত স্ত্রী ‘সুমাইয়া আক্তার’-এর সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্ক বজায় রেখে যোগাযোগ করতে থাকেন ওই প্রবাসী।
এই সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রয়োজন ও অজুহাত দেখিয়ে তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে বিকাশের মাধ্যমে তিন লাখ টাকার বেশি অর্থ নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
প্রতারণার বিষয়টি যাতে সহজে সন্দেহের সৃষ্টি না করে, সে জন্য কথিত ‘সুমাইয়া’র বাবা পরিচয়ে শান্ত আলীর বাবা শহিদুল ইসলামও ওই প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলতেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ জানায়, প্রতারণার অভিযোগের সূত্র ধরে বুধবার সকালে লালপুর উপজেলার গন্ডবিল গ্রামে শান্ত আলীর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানকালে শান্ত আলী ও তার বাবা শহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার বিষয়টিও সামনে আসে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
গ্রেপ্তারের পর থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় শান্ত আলীর মোবাইল ফোনে ওই ইতালি প্রবাসী ফোন করেন।
পুলিশের উপস্থিতিতে কথা বলার সময় তিনি জানতে পারেন, দীর্ঘদিন ধরে যার সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিলেন এবং যাকে ‘সুমাইয়া আক্তার’ নামে একজন নারী হিসেবে চিনতেন, সেই ব্যক্তি আসলে একজন পুরুষ।
বিষয়টি জানার পর ওই প্রবাসী বিস্মিত হন এবং পুলিশের কাছে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান বলে জানা গেছে।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম পলাশ বলেন, গ্রেপ্তার শান্ত আলী ও তার বাবা শহিদুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সক্রিয় সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমোর মতো বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
তদন্তের একপর্যায়ে ইতালি প্রবাসীর সঙ্গে নারী পরিচয়ে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি, মোবাইল ফোনে বিয়ের নাটক এবং অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে।
এ ঘটনায় শান্ত আলী ও শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়।
তবে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তি বা এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ব্যক্তিগত তথ্য বা অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে অনলাইনে পরিচিত কোনো ব্যক্তির পরিচয় যাচাই না করে প্রেম, বিয়ে কিংবা আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়লে প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় যাচাই এবং আর্থিক লেনদেনে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি 






