বিনোদনজগতে কাজের সুযোগ পাওয়ার আশায় অনেক নতুন শিল্পীকে নানা ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে যৌন সুবিধা চাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এবার নিজের অভিনয়জীবনের শুরুর দিকের এমনই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন ভারতীয় টেলিভিশন অভিনেত্রী নীতি টেলর।
অভিনেত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রথম তেলেগু সিনেমার পরিচালক পরবর্তী একটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময় তাঁর কাছে যৌন সম্পর্কের দাবি জানান। এমন অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে হতবাক হয়ে যান নীতি। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি পরিচালকের সঙ্গে তর্কে না জড়িয়ে ফোন কেটে দেন। পরে তাঁর নম্বর ব্লক করে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পুরো ঘটনা জানান।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম হাউটারফ্লাইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন নীতি টেলর। তাঁর বক্তব্য নতুন করে বিনোদনজগতে কাজের সুযোগের বিনিময়ে যৌন সুবিধা চাওয়ার অভিযোগ এবং শিল্পীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের বিষয়টি আলোচনায় এনেছে।
প্রস্তাবে হতবাক হয়ে ফোন কেটে দেন নীতি
সাক্ষাৎকারে নীতি জানান, তাঁর প্রথম তেলেগু সিনেমার কাজ শেষ হওয়ার পর ওই ছবির পরিচালক তাঁকে নতুন একটি সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফোন করেছিলেন। প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিক কাজের আলোচনা বলেই মনে হয়েছিল তাঁর কাছে। কিন্তু কথোপকথনের একপর্যায়ে পরিচালকের বক্তব্য তাঁকে বিস্মিত করে।
নীতির দাবি, নতুন সিনেমায় কাজ করতে হলে পরিচালকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে—এমন শর্ত দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। আকস্মিক এই প্রস্তাবে তিনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে নীতি জানান, পরিচালক তাঁকে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, নতুন সিনেমায় অভিনয় করতে হলে তাঁর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এমন কথা শোনার পর তিনি আর কথোপকথন চালিয়ে যাননি। ফোন কেটে দিয়ে পরিচালকের নম্বর ব্লক করেন।
এরপর মাকে ফোন করে ঘটনাটি জানান তিনি। নীতির বর্ণনা অনুযায়ী, পুরো বিষয়টি তাঁর কাছে এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে কী করা উচিত, সেটিও বুঝতে পারছিলেন না।
‘তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আর সিনেমা করব না’
এই অভিজ্ঞতা নীতির অভিনয়জীবন নিয়ে ভাবনাতেও প্রভাব ফেলেছিল। অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের পরিচিতি তৈরি করার স্বপ্ন থাকলেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পর তিনি চলচ্চিত্রে কাজ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান।
সাক্ষাৎকারে নীতি জানান, সংশ্লিষ্ট পরিচালককে এর আগে অন্য নারীদের সঙ্গে দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু একসময় তাঁর কাছেও এ ধরনের প্রস্তাব আসতে পারে, তা কল্পনা করেননি।
অভিনেত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি জানার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আর কোনো সিনেমায় অভিনয় করবেন না। তাঁর কাছে বিষয়টি শুধু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব ছিল না; বরং অভিনয়জগতে কাজ করার পরিবেশ ও নিজের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে তিনি অভিনয়জীবন পুরোপুরি ছেড়ে দেননি। টেলিভিশন নাটক ও ধারাবাহিকে কাজের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে যান এবং দর্শকদের মধ্যে পরিচিতি অর্জন করেন।
পরিচালকের নাম প্রকাশ করেননি অভিনেত্রী
নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করলেও সাক্ষাৎকারে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের নাম জানাননি নীতি টেলর। ফলে তাঁর বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে পরিচালকের পরিচয় কিংবা তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত।
নীতির বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার পর তিনি পরিচালকের নম্বর ব্লক করে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো অভিযোগও করেননি। পরে সাক্ষাৎকারে অভিজ্ঞতাটি তুলে ধরেন তিনি।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নীতির বক্তব্যকে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ ও অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তেলেগু সিনেমা দিয়ে অভিনয়জীবনের শুরু
নীতি টেলরের অভিনয়জীবন শুরু হয় অল্প বয়সে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে হিন্দি টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘পেয়ার কা বন্ধন’-এর মাধ্যমে অভিনয়জগতে পা রাখেন তিনি। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রেও কাজ করেন।
২০১২ সালে ‘মেম বয়সুকু ভাচাম’ সিনেমার মাধ্যমে তেলেগু চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। ছবিটি পরিচালনা করেন ত্রিনাধা রাও নাক্কিনা। সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন তানিশ। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে ভালো ফল করেছিল বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর ২০১৩ সালে মুক্তি পায় নীতির দ্বিতীয় তেলেগু সিনেমা ‘পেল্লি পুস্তাকাম’। রামকৃষ্ণ মাচাকান্তির পরিচালনায় নির্মিত এ ছবিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন রাহুল রবীন্দ্রন। তবে সিনেমাটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি এবং সমালোচকদের কাছ থেকেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল বলে জানা যায়।
২০১৪ সালে মুক্তি পায় তাঁর তৃতীয় তেলেগু সিনেমা ‘লাভ ডটকম’। রাজা ভানেম রেড্ডি পরিচালিত ছবিটিতে নীতির সঙ্গে অভিনয় করেন আর্য সন্দীপ। এই সিনেমাটিও উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এরপর আর তেলেগু চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়নি তাঁকে।
‘ক্যায়সি ইয়ে ইয়ারিয়া’ দিয়ে ব্যাপক পরিচিতি
দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজ করলেও নীতি টেলর সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পান হিন্দি টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘ক্যায়সি ইয়ে ইয়ারিয়া’-এর মাধ্যমে। এই ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা তৈরি করে এবং টেলিভিশন অঙ্গনে তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
পরবর্তী সময়ে ‘বড়ে আচ্ছে লাগতে হ্যায় ২’-সহ বিভিন্ন টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি রিয়েলিটি শোতেও অংশ নিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
সাম্প্রতিক সময়ে রিয়েলিটি শো ‘অ্যালায়েন্স’-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমেও আলোচনায় আসেন নীতি। ওই প্রতিযোগিতায় তিনি সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিনোদনজগতে নিরাপদ কর্মপরিবেশের প্রশ্ন
নীতি টেলরের এই অভিজ্ঞতার বিবরণ বিনোদনশিল্পে শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টি আবার সামনে এনেছে। অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে যৌন সম্পর্কের দাবি করার মতো আচরণের অভিযোগকে সাধারণ পেশাগত আলোচনা হিসেবে দেখা যায় না। এ ধরনের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বিশেষ করে নতুন শিল্পীরা যখন নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, তখন ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব তাঁদের জন্য মানসিক চাপ ও পেশাগত অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। এ কারণে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অঙ্গনে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং শিল্পীদের সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে নীতি টেলরের বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখানে নেই।
নিজের জীবনের একটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে নীতি টেলর দেখিয়েছেন, অভিনয়জীবনের শুরুতে পাওয়া এমন প্রস্তাব একজন শিল্পীর পেশাগত সিদ্ধান্ত ও মানসিক অবস্থায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিনোদনজগতে কাজের সুযোগের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতি, পেশাগত নৈতিকতা এবং শিল্পীদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

বিনোদন ডেস্ক 






