“ভূমি সেবার শুদ্ধতাই কমাতে পারে সামাজিক বিরোধ”—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বরিশালের গৌরনদী উপজেলা ভূমি অফিসে সেবা কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মেহেদী হাসানের বিভিন্ন উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি ও সরাসরি গণশুনানির কারণে ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সেবাগ্রহীতা ও সচেতন নাগরিকরা।
দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের একটি অংশকে নানা ধরনের হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা, তদবির এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হতো—এমন অভিযোগ ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব সমস্যা কমিয়ে আনতে একাধিক উদ্যোগ নেন এসিল্যান্ড মেহেদী হাসান। এর ফলে ভূমি অফিসের সেবা কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও গতি বেড়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ ও সমস্যার দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে গৌরনদী উপজেলা ভূমি অফিসে বিশেষ গণশুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। “সাপ্তাহিক বৃহস্পতিবার: জনগণের কাছে এসিল্যান্ডের জবাব”—এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা, অভিযোগ, আপত্তি ও পরামর্শ সরাসরি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরাসরি কর্মকর্তার কাছে সমস্যার কথা বলার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অফিসে বারবার ঘোরাঘুরি এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা বিভিন্ন বিষয় দ্রুত যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গণশুনানির সময় সেবার নির্ধারিত সরকারি ফি, আবেদন প্রক্রিয়া এবং ফি পরিশোধের পদ্ধতি সম্পর্কে সেবাগ্রহীতাদের অবহিত করা হচ্ছে। কোনো অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়েছে কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আবেদনকারীর স্বশরীরে উপস্থিতি ও স্বাক্ষর নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় কয়েকজন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ভূমি অফিসে নিজেদের প্রয়োজনীয় কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করার সুযোগ পাচ্ছেন তারা। এতে ভূমি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের ওপর নির্ভরশীলতা আগের তুলনায় কমেছে বলে মনে করছেন তারা।
ভূমি অফিস সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সেবা নিতে এসে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ সরাসরি শুনে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নামজারি বা মিউটেশন কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা, সরকারি খাস জমির সঠিক ব্যবস্থাপনা, ভূমির তথ্য সংরক্ষণে ডাটাবেইজ তৈরি এবং ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভূমির মালিকানা, সীমানা ও রেকর্ড সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে তা পরবর্তী সময়ে পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক বিরোধ এবং দেওয়ানি মামলার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এসব বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমার প্রবণতা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু ভূমি অফিসের সেবা কার্যক্রম নয়, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন এসিল্যান্ড মেহেদী হাসান। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বাজার মনিটরিং, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং মাদকবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার কারণেও স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
গৌরনদীতে দায়িত্ব নেওয়ার আগে নেত্রকোনা ও ভোলার বোরহানউদ্দিনে দায়িত্ব পালন করেছেন মেহেদী হাসান। বোরহানউদ্দিনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বদলির খবরে স্থানীয়দের একাংশ তাঁকে সেখানে রাখার দাবিতে মানববন্ধন করেছিলেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক সেবা ও বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সক্রিয়তার কারণে আগের কর্মস্থলেও তিনি আলোচনায় ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
গৌরনদীর স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) দায়িত্ব নেওয়ার পর ভূমি অফিসের পরিবেশে শৃঙ্খলা ও কাজের গতি বেড়েছে। বিশেষ করে সরাসরি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থাও তৈরি হয়েছে।
একজন সেবাগ্রহীতা বলেন, “আগে ভূমি অফিসে কাজ করতে গেলে কোথায় যেতে হবে, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে—তা বুঝতে সমস্যা হতো। এখন সরাসরি কর্মকর্তার কাছে সমস্যার কথা বলা যায়। এতে ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।”
নিজের উদ্যোগ ও ভূমি সেবা কার্যক্রম সম্পর্কে গৌরনদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, “জনগণের আস্থা অর্জনই আমাদের মূল লক্ষ্য। ভূমি সংক্রান্ত সেবা স্বচ্ছতার সঙ্গে সহজ ও দ্রুত করতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। শুধু নিজে সৎ থাকলেই হবে না; শক্ত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পুরো সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই সরকারি সেবা পান, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে শুধু জনভোগান্তিই কমবে না, ভূমিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধও অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তাদের মতে, ভূমির রেকর্ড, মালিকানা, সীমানা, নামজারি ও সরকারি জমি ব্যবস্থাপনায় সঠিক তথ্য এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে আদালত পর্যন্ত গড়ানো অনেক সমস্যারও প্রাথমিক পর্যায়ে সমাধান করা সম্ভব।
গৌরনদী উপজেলা ভূমি অফিসে চলমান গণশুনানি, নিয়মিত তদারকি, সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি অভিযোগ শোনা এবং ভূমি সেবা সহজীকরণের উদ্যোগকে তাই স্থানীয় পর্যায়ে জনবান্ধব ভূমি সেবা নিশ্চিত করার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সেবাগ্রহীতা ও সচেতন নাগরিকরা।

মোঃ মাসুদ সরদার, বরিশাল ব্যুরো 







