বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং ‘পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’-এর পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অনিয়ম চালিয়ে আসছেন। অভিযোগের পাহাড় জমলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
সূত্র জানায়, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল মেয়াদি প্রায় ১২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ের ‘পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’-এর দায়িত্বে ছিলেন ড. সাজেদুল করিম সরকার। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তৎকালীন প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ আরও দুই বছর বৃদ্ধি করানো হয়। এই অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় রাসায়নিক দ্রব্য, গ্লাসওয়্যার, প্লাস্টিক কনজুমেবল, গ্রাফিক্স সামগ্রীসহ বিভিন্ন গবেষণা উপকরণ ক্রয়ের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে এসব সামগ্রীর বড় একটি অংশ ক্রয় করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল পোল্ট্রি খাতে গবেষণা সম্প্রসারণ এবং ২১টি প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে হস্তান্তর করা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও কোনো প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণার পরিবর্তে নির্মাণকাজ ও অবকাঠামোগত খাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ড. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো স্বজনপ্রীতি। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের স্ত্রীকে বাংলাদেশ জুট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)-এ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেতে সহায়তা করেন।
এছাড়া প্রকল্পে পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ কনসালটেন্ট হিসেবে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ থেকেও নিজের স্ত্রীকে সুবিধা প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কেনা মূল্যবান গবেষণা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরিচালিত একটি ল্যাবরেটরির দায়িত্বও তার স্ত্রীকে দেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, ল্যাবটির কার্যক্রম বাস্তবে খুব একটা দৃশ্যমান নয় এবং অধিকাংশ কার্যক্রম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে আত্মীয়তার সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নিজের শ্যালক, ভাগ্নিজামাই, চাচাতো ভাই, মামাতো আত্মীয়, ভাতিজির জামাতা, আত্মীয়-স্বজনের বউসহ প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন নিকটাত্মীয়কে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়োগের পেছনে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনও হয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ড. সাজেদুল করিম সরকার ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সক্রিয় উপস্থিতি ছিল তার।
সূত্রগুলোর দাবি, সরকারের পরিবর্তনের পরও তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিগত সরকারের পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট, ছবি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতি এখনো দৃশ্যমান রয়েছে। এ বিষয়টি নিয়েও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা আলোচনা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে বিতর্কিত প্রকল্প পরিচালক এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে ড. সাজেদুল করিম সরকারের ক্ষেত্রে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে ও বাইরে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এত অভিযোগ ও বিতর্কের পরও কীভাবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতের বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
(উল্লেখ্য, উল্লিখিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি। যথাযথ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।)

বাংলাদেশ খবর ডেস্ক 



