টালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের কাছে দুর্গাপূজা কেবল কয়েক দিনের উৎসব নয়। তাঁর কাছে এই আয়োজন বাঙালির শিকড়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি বিশেষ সময়। ছোটবেলা থেকে দুর্গাপূজাকে ঘিরে যে আবেগ ও ভালোবাসা তাঁর মনে তৈরি হয়েছে, সময়ের সঙ্গে তা একটুও কমেনি বলে জানিয়েছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী।
দুর্গাপূজার সময় পোশাক ও সাজসজ্জার ক্ষেত্রেও নিজের পছন্দের কথা জানিয়েছেন ঋতুপর্ণা। তাঁর মতে, পূজার সাজে অতিরিক্ত আড়ম্বরের চেয়ে সাবেকি ও মার্জিত বাঙালি সাজেই রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। বড় টিপ, চোখভরা কাজল এবং লাল-সাদা কিংবা হালকা রঙের সুতি শাড়ি—এমন সাধারণ অথচ নান্দনিক সাজেই তিনি খুঁজে পান বাঙালিয়ানার স্বাভাবিক সৌন্দর্য।
সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুর্গাপূজা, নিজের সাজ, শাড়ির প্রতি ভালোবাসা এবং মায়ের স্মৃতিসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন অভিনেত্রী।
পূজা মানেই শিকড়ের টান
এবার দুর্গাপূজায় কেমন সাজবেন, কলকাতায় থাকবেন কি না—এমন নানা প্রশ্নের উত্তরে ঋতুপর্ণা জানান, দুর্গাপূজার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু উৎসবকেন্দ্রিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের আবেগ ও পারিবারিক স্মৃতি।
অভিনেত্রীর ভাষায়, দুর্গাপূজা তাঁর কাছে শুধু চার দিনের আয়োজন নয়। এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহ্য। জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এই আবেগ কখনো পুরোনো হয়ে যায় না।
ছোটবেলা থেকে পূজাকে ঘিরে তাঁর যে আনন্দ ও টান, আজও সেটি একই রকম রয়েছে বলে জানান তিনি। বয়স ও ব্যস্ততা বাড়লেও দুর্গাপূজার প্রতি সেই আবেগে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সাবেকি সাজেই স্বাচ্ছন্দ্য
পূজার সাজ নিয়ে ঋতুপর্ণার পছন্দও বেশ স্পষ্ট। আধুনিক ফ্যাশনের নানা আয়োজন থাকলেও দুর্গাপূজায় তিনি বরাবরই ঐতিহ্যবাহী ও মার্জিত বাঙালি সাজকে প্রাধান্য দেন।
বড় টিপ, চোখে গাঢ় কাজল এবং লাল-সাদা কিংবা কোমল রঙের কটন শাড়ি—এই সরল সাজের মধ্যেই তিনি খুঁজে পান বাঙালি নারীর ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য।
তাঁর মতে, পূজার সাজে অতিরিক্ত চাকচিক্যের প্রয়োজন নেই। বরং পোশাকে ও সাজে ব্যক্তিগত রুচি এবং নিজস্বতার ছাপ থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ। সাবেকি পোশাকের সঙ্গে স্বাভাবিক সাজ মিলিয়ে নিলে বাঙালিয়ানার সৌন্দর্য আরও ফুটে ওঠে।
শাড়ির প্রতি ভালোবাসা সারা বছর
পূজার আগে আলাদাভাবে কেনাকাটার সুযোগ খুব বেশি পান না ঋতুপর্ণা। অভিনয়, কাজ এবং বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে পূজার ঠিক আগে নিজের জন্য কেনাকাটা করার সময় কমই পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
তবে শাড়ির প্রতি তাঁর ভালোবাসা সারা বছরের। তাই পূজার জন্য আলাদা করে বড় ধরনের কেনাকাটা না করলেও বছরের বিভিন্ন সময়ে পছন্দের শাড়ি সংগ্রহ করতে থাকেন।
অভিনেত্রী জানান, অনেক সময় বিভিন্ন মানুষ ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দিয়ে তাঁর জন্য বিশেষভাবে শাড়ি তৈরি করে দেন। এসব শাড়ি তাঁর কাছে শুধু পোশাক নয়; প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আলাদা গল্প, স্মৃতি ও ভালোবাসা।
মায়ের স্মৃতিতে বদলে গেছে উপহারের আনন্দ
দুর্গাপূজার সঙ্গে ঋতুপর্ণার ব্যক্তিগত স্মৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন তাঁর মা। পূজার সময় মায়ের কাছ থেকে পাওয়া উপহারের স্মৃতি এখনও অভিনেত্রীর মনে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
মাকে হারানোর পর পূজায় উপহার পাওয়ার আনন্দও তাঁর কাছে আগের মতো নেই বলে জানান তিনি। এখন কেউ যখন আন্তরিকতা ও ভালোবাসা দিয়ে তাঁকে কিছু উপহার দেন, তখন সেই উপহারের মধ্যে তিনি মায়ের স্নেহের স্পর্শ খুঁজে পান।
এই স্মৃতিই হয়তো পূজার আনন্দকে তাঁর কাছে আরও আবেগময় করে তোলে। উপহারের মূল্য নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভালোবাসা ও আন্তরিকতাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পূজায় অন্যকে উপহার দিতে ভালোবাসেন
নিজে উপহার পাওয়ার পাশাপাশি অন্যদের কিছু দিতে পারলেও আনন্দ পান ঋতুপর্ণা। পূজার সময়ে প্রিয়জনদের জন্য উপহার বেছে নেওয়া এবং তাঁদের মুখে হাসি দেখতে পারাকে তিনি বিশেষ আনন্দের বিষয় হিসেবে দেখেন।
তাঁর কথায়, পূজার আনন্দ শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়। কাছের মানুষদের সঙ্গে ভালোবাসা ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য।
পূজার চার দিন কোনো বাঁধাধরা রুটিন নয়
ব্যস্ত অভিনয়জীবনে নিয়ম ও রুটিন মেনে চললেও দুর্গাপূজার কয়েকটি দিনকে সেই নিয়মের বাইরে রাখতে চান ঋতুপর্ণা।
তিনি জানান, পূজার সময়ে কোনো কঠোর রুটিন অনুসরণ করার প্রয়োজন অনুভব করেন না। বরং এই কয়েকটি দিন আড্ডা, ভালোবাসা, আনন্দ, মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো এবং মায়ের আরাধনায় কাটাতেই তাঁর ভালো লাগে।
তাঁর কাছে পূজার সময় মানেই স্বাভাবিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠা। তাই এই সময়ে অতিরিক্ত নিয়মকানুন বা সময়ের বাঁধাধরা হিসাবের পরিবর্তে মুহূর্তগুলো উপভোগ করতেই বেশি আগ্রহী তিনি।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে আবেগের বন্ধন
ঋতুপর্ণার কথায় বারবার উঠে এসেছে দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। তাঁর কাছে এই উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে নতুন পোশাক, শাড়ি, সাজসজ্জা, আড্ডা, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক বিশেষ আবহ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যই পূজাকে অন্য উৎসবের তুলনায় আলাদা মাত্রা দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অভিনেত্রীর কাছে দুর্গাপূজা তাই একই সঙ্গে স্মৃতি, সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন ও আনন্দের নাম।
মায়ের আরাধনায় আনন্দের চার দিন
দুর্গাপূজার চার দিনকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে চান ঋতুপর্ণা। এই সময়ে কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো, আড্ডা দেওয়া এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, পূজার জাঁকজমকের চেয়ে আবেগ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। শাড়ি, টিপ, কাজল কিংবা সাজসজ্জা উৎসবের অংশ হলেও এর পেছনে থাকা ভালোবাসা ও স্মৃতিই তাঁর কাছে বেশি মূল্যবান।
‘দুর্গাপূজা বছরের সবচেয়ে সুন্দর সময়’
দুর্গাপূজাকে বছরের অন্যতম সুন্দর সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। তাঁর মতে, এই উৎসব বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে এর আনন্দ আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না।
শৈশব থেকে যে আবেগ নিয়ে তিনি পূজাকে দেখেছেন, আজও সেই আবেগ অটুট। সময় বদলেছে, জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে, কিন্তু দুর্গাপূজাকে ঘিরে তাঁর ভালোবাসা ও স্মৃতির জায়গাটি একই রয়ে গেছে।
সাবেকি শাড়ি, বড় টিপ, চোখভরা কাজল আর স্বাভাবিক সাজে বাঙালিয়ানার যে সৌন্দর্য তিনি খুঁজে পান, সেটিই তাঁর পূজার ফ্যাশন ভাবনার মূল কথা। আর উৎসবের ভেতরে পরিবার, প্রিয়জন, স্মৃতি ও ভালোবাসার যে বন্ধন তৈরি হয়, সেটিই তাঁর কাছে দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
ঋতুপর্ণার কথায়, দুর্গাপূজা শেষ পর্যন্ত শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়—এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, শিকড়ের টান এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক আবেগের নাম।

বিনোদন ডেস্ক 









