নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাদেশ খবর
মুসলমানদের কাছে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জুমার দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন এবং এ দিনের জন্য বিশেষ কিছু আমল ও আদবের কথা জানিয়েছেন। পবিত্রতা অর্জন, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার, আগে মসজিদে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বেশি বেশি দরুদ পাঠ এবং দোয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া—জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে মহানবী (সা.) জুমার দিনকে সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ দিনে হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং কিয়ামতও জুমার দিনেই সংঘটিত হবে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
জুমার দিনে মহানবী (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ আমল
১. জুমার দিন গোসল করা
জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হলো গোসল করা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার নামাজে আসবে, সে যেন গোসল করে। সহিহ বুখারিতে এ নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে।
জুমার দিন গোসলের উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়; বরং নামাজ ও মসজিদে উপস্থিত হওয়ার আগে নিজেকে সুন্দর ও পরিপাটি করে নেওয়াও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
২. দাঁত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন হওয়া
জুমার দিনের প্রস্তুতিতে দাঁত পরিষ্কার করার কথাও হাদিসে এসেছে। সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায় জুমার দিনের গোসলের পাশাপাশি মিসওয়াক করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই বর্ণনায় সামর্থ্য থাকলে সুগন্ধি ব্যবহারের কথাও এসেছে।
বর্তমান সময়ে মিসওয়াকের পাশাপাশি দাঁত ব্রাশ করেও মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখা যায়। মূল উদ্দেশ্য হলো পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে আল্লাহর ঘরে নামাজের জন্য যাওয়া।
৩. সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হয়ে মসজিদে যাওয়া
জুমার দিনে নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মসজিদে যাওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহিহ বুখারির হাদিসে গোসলের পর ভালোভাবে পবিত্র হওয়া, তেল বা সুগন্ধি ব্যবহার করে জুমার নামাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার কথা এসেছে।
তাই জুমার দিন অগোছালো অবস্থায় নয়, বরং পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে মসজিদে যাওয়া উত্তম।
৪. আগে আগে মসজিদে যাওয়া
জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো যতটা সম্ভব আগে মসজিদে পৌঁছানো।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করেন এবং আগত মুসল্লিদের ক্রমানুসারে লিখতে থাকেন। যে ব্যক্তি আগে আসে তার জন্য বড় সওয়াবের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। ইমাম খুতবার জন্য বসলে ফেরেশতারা তাদের নথি বন্ধ করে খুতবা শুনতে থাকেন।
এ থেকে বোঝা যায়, জুমার নামাজের জন্য শেষ মুহূর্তে না গিয়ে সময় হাতে রেখে মসজিদে পৌঁছানো উত্তম।
৫. মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ পড়া
জুমার আগে মসজিদে গিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ পড়ার কথাও সহিহ হাদিসে এসেছে।
হাদিসে এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে জুমার দিন গোসল করে, নিজেকে পরিষ্কার করে, সুগন্ধি ব্যবহার করে, মসজিদে গিয়ে অন্য মুসল্লিদের কষ্ট না দিয়ে নিজের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ নামাজ আদায় করে এবং ইমাম খুতবা শুরু করলে নীরব থাকে। এমন ব্যক্তির জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত গুনাহ মাফের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
৬. মুসল্লিদের মাঝখানে জোর করে জায়গা নেওয়া নয়
অনেক সময় দেরিতে মসজিদে গিয়ে মানুষ সামনের দিকে যাওয়ার জন্য দুই মুসল্লির মাঝখানে জোর করে ঢুকে পড়েন। এটি জুমার দিনের আদবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সহিহ বুখারির হাদিসে জুমার দিন অন্য দুজনের মাঝখানে গিয়ে তাদের বিচ্ছিন্ন না করার নির্দেশ এসেছে। তাই আগে থেকেই মসজিদে গিয়ে সুন্দরভাবে জায়গা নেওয়া উত্তম।
৭. খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা
জুমার খুতবা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। ইমাম খুতবা শুরু করলে মুসল্লির উচিত মনোযোগ দিয়ে তা শোনা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় জুমার দিনের এমন ব্যক্তির ফজিলত এসেছে, যে ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় নীরব থাকে।
তাই খুতবার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, অন্যের সঙ্গে গল্প করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থাকা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৮. মহানবী (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ
জুমার দিনের অন্যতম বিশেষ আমল হলো মহানবী (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
সুনানে আবু দাউদের একটি সহিহ বর্ণনায় মহানবী (সা.) বলেছেন, জুমার দিন উত্তম দিনগুলোর একটি এবং এ দিনে তাঁর ওপর বেশি বেশি সালাত বা দরুদ পাঠ করতে বলা হয়েছে।
তাই জুমার দিন প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা।
৯. আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা
জুমার দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এ দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার সুসংবাদ হাদিসে এসেছে।
সহিহ বুখারির হাদিসে মহানবী (সা.) জুমার দিনের ওই বিশেষ সময়ের কথা বলেছেন এবং জানিয়েছেন, কোনো মুসলিম সে সময়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন।
তাই জুমার দিনে নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া, হেদায়েত, সুস্থতা, হালাল রিজিক, পরিবার ও সমাজের কল্যাণ এবং আখিরাতের মুক্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
১০. জুমার নামাজ আদায় করা
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো জুমার নামাজ। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও শরিয়তসম্মতভাবে যাদের ওপর জুমা প্রযোজ্য, তাদের জন্য জুমার নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মহানবী (সা.) নিজে জুমার নামাজ আদায় করেছেন এবং সাহাবিদেরও এর গুরুত্ব শিক্ষা দিয়েছেন।
জুমার নামাজের আগে খুতবা শোনা এবং এরপর জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা জুমার দিনের মূল ইবাদত।
১১. জুমার নামাজে নির্দিষ্ট কিছু সূরা পাঠের সুন্নাহ
মহানবী (সা.) জুমার দিনের ফজরের নামাজে সূরা আস-সাজদাহ ও সূরা আল-ইনসান পাঠ করতেন বলে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
এ ছাড়া জুমার নামাজে সূরা আল-জুমুআ ও সূরা আল-মুনাফিকুন পাঠ করার বর্ণনাও সহিহ মুসলিমে রয়েছে। অন্য বর্ণনায় সূরা আল-আ’লা ও সূরা আল-গাশিয়াহ পাঠের কথাও এসেছে।
এগুলো থেকে বোঝা যায়, জুমার দিনের নামাজে মহানবী (সা.) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সূরা পাঠ করেছেন।
জুমার দিন কীভাবে নিজের সময় সাজাবেন?
একজন মুসলমান চাইলে জুমার দিনটি এভাবে সাজাতে পারেন—
ফজরের নামাজ → কোরআন তিলাওয়াত → গোসল ও পরিচ্ছন্নতা → মিসওয়াক/দাঁত পরিষ্কার → পরিচ্ছন্ন পোশাক → সুগন্ধি ব্যবহার → বেশি বেশি দরুদ → আগে মসজিদে যাওয়া → নফল নামাজ → খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা → জুমার নামাজ → দোয়া ও জিকির।
এর পাশাপাশি দিনের অন্য সময়েও আল্লাহর স্মরণ, ইস্তিগফার ও দরুদ পাঠ করা যেতে পারে।
জুমার দিনের আমল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
জুমার দিনের আমল নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক প্রচলিত কথা রয়েছে। এর সবগুলোকে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়। কোনো আমলকে “রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত করতেন” বলার আগে নির্ভরযোগ্য হাদিসের সূত্র যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে সূরা কাহফ জুমার দিনে পড়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও এর বর্ণনাগুলোর মান নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাই এটিকে ফরজ বা জুমার দিনের আবশ্যিক আমল হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
জুমার দিন হোক ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির দিন
জুমা শুধু সপ্তাহের একটি বিশেষ নামাজের দিন নয়; এটি একজন মুসলমানের জন্য আত্মশুদ্ধি, তওবা, দোয়া, দরুদ ও আল্লাহর স্মরণের সুযোগও বটে।
মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে জুমার দিন গোসল ও পরিচ্ছন্নতা, সময়মতো মসজিদে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা, জুমার নামাজ আদায়, বেশি বেশি দরুদ পাঠ এবং দোয়ার মাধ্যমে কাটানো যেতে পারে।
জুমার দিন হোক পরিচ্ছন্নতা, ইবাদত, দরুদ, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির দিন—মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে শুরু হোক বরকতময় একটি দিন।

ইসলামিক ডেস্ক 








