
হাত থেকে মাঝেমধ্যে ফোন বা অন্য কোনো জিনিস পড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। অসাবধানতা, ক্লান্তি কিংবা সাময়িক মনোযোগের ঘাটতির কারণেও এমন হতে পারে। কিন্তু একই ঘটনা যদি নিয়মিত ঘটতে থাকে এবং এর সঙ্গে জামার বোতাম লাগাতে সমস্যা, হাতের লেখায় পরিবর্তন, আঙুলে ঝিনঝিন বা অসাড়তা দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতের স্বাভাবিক কর্মদক্ষতা কমে যাওয়ার সঙ্গে যদি পায়ে দুর্বলতা, ভারসাম্যহীনতা কিংবা হাঁটতে অসুবিধা যুক্ত হয়, তাহলে সমস্যার উৎস শুধু হাতের পেশি বা স্নায়ুতে নাও থাকতে পারে। ঘাড়ের মেরুদণ্ডে থাকা স্পাইনাল কর্ডে চাপ পড়লেও এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ঘাড়ের মেরুদণ্ডে চাপ পড়ে যে সমস্যা
ঘাড়ের মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে স্পাইনাল কর্ড বা সুষুম্নাকাণ্ড চলে গেছে। এটি মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে স্নায়বিক সংকেত পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ঘাড়ের মেরুদণ্ডের ভেতরে কোনো কারণে স্পাইনাল কর্ড সংকুচিত বা চাপে পড়লে শরীরের নড়াচড়া, অনুভূতি ও ভারসাম্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সারভিক্যাল মায়েলোপ্যাথি বলা হয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে ঘাড়ের মেরুদণ্ডে ক্ষয়জনিত পরিবর্তন তৈরি হওয়া এ সমস্যার অন্যতম কারণ হতে পারে। আর্থ্রাইটিস, হাড়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি, লিগামেন্ট মোটা হয়ে যাওয়া কিংবা মেরুদণ্ডের ডিস্ক ফুলে ওঠার মতো পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে স্পাইনাল কর্ডের জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
হাতের জড়তা হতে পারে প্রথম সতর্ক সংকেত
সারভিক্যাল মায়েলোপ্যাথির ক্ষেত্রে শুরুতে হাতের সূক্ষ্ম কাজ করার ক্ষমতায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। অনেক সময় রোগী নিজেই বুঝতে পারেন যে আগের মতো সহজে ছোটখাটো কাজ করতে পারছেন না।
হাতের জড়তার কারণে বারবার ফোন, চাবি, কাপ বা অন্যান্য জিনিস হাত থেকে পড়ে যেতে পারে। জামার বোতাম লাগানো, কলম দিয়ে লেখা, মোবাইলে টাইপ করা কিংবা ছোট কোনো বস্তু ধরার মতো কাজেও অসুবিধা তৈরি হতে পারে।
কারও ক্ষেত্রে হাতের লেখা আগের তুলনায় বদলে যেতে পারে। আঙুল, হাত বা বাহুতে অসাড়তা কিংবা ঝিনঝিন অনুভূতিও দেখা দিতে পারে।
শুধু হাত নয়, প্রভাব পড়তে পারে পায়েও
এই সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এর প্রভাব শুধু হাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। স্পাইনাল কর্ডের ওপর চাপ বাড়লে পায়ের নড়াচড়া ও ভারসাম্যেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
হাঁটার সময় বারবার হোঁচট খাওয়া, পা ভারী বা শক্ত মনে হওয়া কিংবা স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে অসুবিধা হওয়া এর সম্ভাব্য লক্ষণ। কারও কারও হাঁটার সময় দেয়াল বা আশপাশের কোনো কিছুর সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই হাতের দুর্বলতা বা জড়তার পাশাপাশি হাঁটার ধরনে পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন।
ঘাড়ে ব্যথা না থাকলেও সমস্যা হতে পারে
অনেকের ধারণা, ঘাড়ের মেরুদণ্ডে সমস্যা হলে অবশ্যই তীব্র ঘাড়ের ব্যথা থাকবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সব রোগীর ক্ষেত্রে এমনটা নাও হতে পারে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতের অসাড়তা, ঝিনঝিন ভাব, সূক্ষ্ম কাজ করতে অসুবিধা কিংবা হাঁটার ভারসাম্য নষ্ট হওয়াই প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে। ফলে ঘাড়ে তীব্র ব্যথা নেই বলে মেরুদণ্ডের সমস্যার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
সারভিক্যাল মায়েলোপ্যাথির সম্ভাবনা থাকলে চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, পূর্বের রোগের ইতিহাস এবং সমস্যাটি কীভাবে শুরু হয়েছে তা জানতে চান। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী স্নায়বিক ও শারীরিক পরীক্ষা করা হয়।
উপসর্গ ও পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে সারভিক্যাল স্পাইনের এমআরআই করার পরামর্শ দিতে পারেন। এতে ঘাড়ের মেরুদণ্ড, ডিস্ক এবং স্পাইনাল কর্ডের অবস্থা দেখা যায়। কোথাও স্পাইনাল কর্ডে চাপ বা সংকোচন তৈরি হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করতেও এমআরআই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের অবস্থার ওপর
সারভিক্যাল মায়েলোপ্যাথির চিকিৎসা সবার জন্য একই নয়। সমস্যার কারণ, উপসর্গের মাত্রা এবং স্পাইনাল কর্ডের ওপর চাপের পরিমাণ বিবেচনা করে চিকিৎসার ধরন নির্ধারণ করা হয়।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ ও অস্ত্রোপচার ছাড়া অন্যান্য চিকিৎসা যথেষ্ট হতে পারে। আবার স্পাইনাল কর্ডে উল্লেখযোগ্য চাপ থাকলে বা স্নায়বিক সমস্যা ক্রমশ বাড়তে থাকলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই কোনো উপসর্গ দেখা দিলেই নিজে থেকে চিকিৎসা শুরু না করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন অবহেলা করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে
স্পাইনাল কর্ডের ওপর দীর্ঘ সময় চাপ থাকলে স্নায়ুর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চাপ অব্যাহত থাকলে কিছু ক্ষেত্রে স্নায়বিক সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে হাতের জড়তা, বারবার জিনিস পড়ে যাওয়া, অসাড়তা, ঝিনঝিন ভাব, দুর্বলতা কিংবা হাঁটার ভারসাম্যহীনতাকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কখন সতর্ক হবেন?
মাঝেমধ্যে হাত থেকে ফোন পড়ে যাওয়া নিয়ে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিচের লক্ষণগুলো নিয়মিত দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
বারবার হাত থেকে ফোন বা জিনিস পড়ে যাওয়া;
বোতাম লাগাতে বা খুলতে সমস্যা হওয়া;
চাবি বা ছোট বস্তু ধরতে অসুবিধা;
হাতের লেখায় পরিবর্তন;
আঙুল বা হাতে অসাড়তা;
হাত বা বাহুতে ঝিনঝিন ভাব;
হাত-পায়ে দুর্বলতা;
হাঁটার সময় বারবার হোঁচট খাওয়া;
শরীরের ভারসাম্য রাখতে সমস্যা;
পা ভারী বা শক্ত মনে হওয়া।
অবহেলা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
হাত থেকে এক-দুবার ফোন পড়ে যাওয়া কোনো নির্দিষ্ট রোগের প্রমাণ নয়। তবে এর সঙ্গে যদি হাতের জড়তা, অসাড়তা, ঝিনঝিন ভাব, দুর্বলতা অথবা হাঁটার ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
শরীরের এমন পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই উপসর্গ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। সময়মতো কারণ শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব এবং গুরুতর স্নায়বিক জটিলতার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
Web: bdkhabor.com. call : +8801823218888. Email: infobdkhabar@gmail.com
▶️ youtube.com/@bdkhabortv 📸 instagram.com/bdkhabar 📘 facebook.com/bdkhabor1 🐦 x.com/b_khabor 🎵 tiktok.com/@sagarbd_official