
বিশ্বজুড়ে নারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি স্তন ক্যানসার। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জেনেটিক কারণ, ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয় এ রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে স্তন ক্যানসার প্রতিরোধের কোনো একক বা শতভাগ কার্যকর উপায় নেই। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে স্ক্রিনিং করানো ঝুঁকি কমানো ও রোগটি দ্রুত শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে স্তন ক্যানসারের একটি তুলনামূলক কম পরিচিত ধরন ইনভেসিভ লোবিউলার কার্সিনোমা (Invasive Lobular Carcinoma—ILC) নিয়েও গুরুত্ব বাড়ছে। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এটি স্তনের লোবিউল বা দুধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি থেকে শুরু হওয়া এক ধরনের ইনভেসিভ ক্যানসার এবং ইনভেসিভ স্তন ক্যানসারের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ILC হয়ে থাকে।
কেন ইনভেসিভ লোবিউলার কার্সিনোমা আলাদা?
সাধারণভাবে অনেক স্তন ক্যানসারে শক্ত গাঁট অনুভূত হতে পারে। কিন্তু ইনভেসিভ লোবিউলার কার্সিনোমা অনেক সময় স্তনের ভেতরে ছড়িয়ে ছড়িয়ে বৃদ্ধি পায়। ফলে স্পষ্ট কোনো শক্ত গাঁট সবসময় অনুভূত নাও হতে পারে এবং শারীরিক পরীক্ষা বা কিছু ইমেজিং পরীক্ষায় এটি শনাক্ত করাও তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
এই ধরনের ক্যানসারে স্তনের আকার বা গঠনে পরিবর্তন, মোটা বা শক্ত অনুভূতি, ত্বকের পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। তবে সব রোগীর উপসর্গ একই রকম হয় না। তাই স্তনে নতুন বা অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ILC শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। গবেষণা ও চিকিৎসা-তথ্যে দেখা যায়, অন্যান্য স্তন ক্যানসারের তুলনায় এটি কিছু নির্দিষ্ট অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতায় ভিন্নতা দেখাতে পারে এবং চিকিৎসার পর দীর্ঘ সময় পরেও ফিরে আসতে পারে।
পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে সতর্কতা বাড়াতে হবে
পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে ব্যক্তির ঝুঁকি সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় বাড়তে পারে। একইভাবে কিছু বংশগত জিনগত পরিবর্তনও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই যে একজন নারী অবশ্যই স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন—এমন নয়।
পরিবারে একাধিক সদস্যের স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে, বিশেষ করে অল্প বয়সে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা থাকলে, চিকিৎসকের সঙ্গে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
ব্যায়াম কি স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে?
নিয়মিত ব্যায়ামকে স্তন ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চয়তামূলক পদ্ধতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তবে বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমকে স্তন ক্যানসারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে ১৫০–৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম অথবা ৭৫–১৫০ মিনিট উচ্চমাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করার পরামর্শ দেয়। সক্ষমতা অনুযায়ী এর সঙ্গে পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও যুক্ত করা যেতে পারে।
হাঁটা, দ্রুত হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতারসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কার্যক্রম দৈনন্দিন জীবনে যুক্ত করা যেতে পারে। তবে বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, পূর্বের অসুস্থতা বা চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী ব্যায়ামের মাত্রা আলাদা হওয়া স্বাভাবিক।
যে ব্যায়ামগুলো করা যেতে পারে
১. উষ্ট্রাসন বা Camel Pose
যোগব্যায়ামের অন্যতম পরিচিত আসন উষ্ট্রাসন। এটি করার সময় প্রথমে ম্যাটের ওপর হাঁটু মুড়ে বসতে হয়। এরপর শরীর সামান্য পেছনের দিকে নিয়ে দুই হাত দিয়ে গোড়ালি ধরার চেষ্টা করতে হয়। বুক সামনে ও ওপরের দিকে প্রসারিত রেখে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে হয়।
সক্ষমতা অনুযায়ী কিছুক্ষণ অবস্থান করে ধীরে ধীরে আগের ভঙ্গিতে ফিরে আসা যায়।
তবে উষ্ট্রাসন করলে থাইরয়েড বা প্যারাথাইরয়েডের কার্যকারিতা বাড়বে এবং হরমোনের ভারসাম্য নিশ্চিত হবে—এমন দাবির পক্ষে স্তন ক্যানসার প্রতিরোধের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই এটিকে সাধারণ নমনীয়তা ও শারীরিক সুস্থতার একটি যোগব্যায়াম হিসেবে দেখা উচিত, ক্যানসার প্রতিরোধের চিকিৎসা হিসেবে নয়।
সতর্কতা: ঘাড়, কোমর, হাঁটু বা মেরুদণ্ডে সমস্যা থাকলে এবং গর্ভাবস্থা বা অন্য কোনো বিশেষ শারীরিক অবস্থায় চিকিৎসক বা প্রশিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া এই আসন করা উচিত নয়।
২. ওয়াল পুশ-আপ
দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দুই পায়ের মধ্যে আরামদায়ক দূরত্ব রাখুন। দুই হাতের তালু কাঁধের উচ্চতায় দেয়ালে রাখুন। শরীরকে সোজা রেখে ধীরে ধীরে কনুই ভাঁজ করে বুক ও কাঁধ দেয়ালের দিকে নিয়ে যান। এরপর হাতের ওপর ভর দিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসুন।
শুরুতে ৮–১০ বার দিয়ে শুরু করে সক্ষমতা অনুযায়ী ১০–১২ বার করা যেতে পারে।
ওয়াল পুশ-আপ তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়ায় যারা নতুন ব্যায়াম শুরু করছেন, তাদের জন্য এটি উপযোগী হতে পারে। তবে কোনো ব্যায়াম করার সময় ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যেতে হবে।
৩. বার্পি
বার্পি একটি অপেক্ষাকৃত উচ্চমাত্রার ব্যায়াম। প্রচলিত বার্পির মধ্যে স্কোয়াট, প্ল্যাঙ্ক, পুশ-আপ ও লাফের মতো একাধিক মুভমেন্ট থাকতে পারে।
প্রথমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হালকা লাফ দেওয়া যায়। এরপর শরীর নিচু করে স্কোয়াটের ভঙ্গিতে গিয়ে দুই হাত মাটিতে রাখতে হয়। পা পেছনে নিয়ে প্ল্যাঙ্কের অবস্থানে যেতে হয়। সক্ষমতা থাকলে পুশ-আপ করে আবার পা সামনে এনে দাঁড়িয়ে উঠতে হয়।
তবে নতুনদের জন্য পূর্ণাঙ্গ বার্পি কঠিন হতে পারে। তাই শুরুতে লাফ বাদ দিয়ে বা পুশ-আপের পরিবর্তে সহজ সংস্করণ করা যেতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, জয়েন্টের সমস্যা, সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে উচ্চমাত্রার ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ক্যানসার থেকে বাঁচতে শুধু ব্যায়াম যথেষ্ট নয়
স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে একমাত্র প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা মনে করা ঠিক নয়। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার মতো জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে মেনোপজের পর অতিরিক্ত ওজন স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা উপকারী হতে পারে।
নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু ব্যায়াম করলেই স্তন ক্যানসার শনাক্ত করা বা প্রতিরোধ করা যায় না। বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় স্তন পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং করানো গুরুত্বপূর্ণ।
স্তনে নতুন গাঁট, অস্বাভাবিক শক্তভাব, আকার বা আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকের অস্বাভাবিকতা, বোঁটা থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ কিংবা অন্য কোনো নতুন পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ক্যানসার চিকিৎসার পরও শারীরিক কার্যক্রমের গুরুত্ব রয়েছে
যারা স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন ক্যানসার থেকে বেঁচে থাকা নারীদের মধ্যে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার সঙ্গে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কম থাকা এবং সামগ্রিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ভালো ফলাফলের সম্পর্ক রয়েছে।
তবে ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন বা চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে রোগীর চিকিৎসক বা ক্যানসার কেয়ার টিমের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। রোগের ধরন, চিকিৎসার পর্যায়, শারীরিক সক্ষমতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
শেষ কথা
স্তন ক্যানসার প্রতিরোধে কোনো একটি ব্যায়ামকে ‘জাদুকরি সমাধান’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন, সুষম জীবনযাপন, ব্যক্তিগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা ও স্ক্রিনিং—সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে কিংবা স্তনে কোনো নতুন পরিবর্তন দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা ও দ্রুত শনাক্তকরণ অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে পারে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্যের জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ বা রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়।
Web: bdkhabor.com. call : +8801823218888. Email: infobdkhabar@gmail.com
▶️ youtube.com/@bdkhabortv 📸 instagram.com/bdkhabar 📘 facebook.com/bdkhabor1 🐦 x.com/b_khabor 🎵 tiktok.com/@sagarbd_official