
স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। কাজ, পড়াশোনা, বিনোদন কিংবা যোগাযোগ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। ফলে চোখে ক্লান্তি, শুষ্কতা, ঝাপসা দেখা কিংবা মাথাব্যথার মতো নানা ধরনের অস্বস্তির অভিযোগও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ব্লু-লাইট চশমা। এসব চশমার লেন্স স্ক্রিন থেকে আসা নীল আলোর একটি অংশ কমানোর বা ফিল্টার করার দাবি করে বাজারজাত করা হয়। চোখের ক্ষতি, চোখের ক্লান্তি এবং ঘুমের সমস্যা কমাতে এই চশমা ব্যবহারের পরামর্শও বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়।
কিন্তু গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে চোখের ক্লান্তি কমানোর ক্ষেত্রে ব্লু-লাইট চশমার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখে যে চাপ বা অস্বস্তি তৈরি হয়, তার জন্য নীল আলোকে একমাত্র বা প্রধান কারণ হিসেবে দেখার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
ব্লু-লাইট চশমার লেন্স সাধারণত স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলোর নির্দিষ্ট অংশ ফিল্টার করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। বাজারজাত করার সময় এগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে চোখের ক্লান্তি কমানোর উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তবে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় এ ধরনের লেন্স ব্যবহারের সঙ্গে সাধারণ লেন্স ব্যবহারের তুলনা করা হয়েছে। একই ধরনের স্ক্রিনে কাজ করা মানুষের মধ্যে একদলকে ব্লু-লাইট ফিল্টারযুক্ত চশমা এবং অন্যদলকে সাধারণ লেন্স ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।
পরীক্ষার ফলাফলে দুই দলের চোখের ক্লান্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে চোখে যে ক্লান্তি বা অস্বস্তি তৈরি হয়, সেটি কমানোর ক্ষেত্রে ব্লু-লাইট চশমা সাধারণ লেন্সের তুলনায় স্পষ্ট বাড়তি সুবিধা দেয়—এমন শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখে অস্বস্তি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো চোখের পলক কম ফেলা।
স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ নিয়মিত পলক ফেলেন। কিন্তু মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্য কোনো স্ক্রিনে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকার সময় পলক ফেলার হার কমে যেতে পারে। এতে চোখের ওপরের অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে যায়। ফলে চোখের পৃষ্ঠে শুষ্কতা তৈরি হয়ে জ্বালাপোড়া, খসখসে অনুভূতি কিংবা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘ সময় কাছ থেকে স্ক্রিন দেখাও চোখের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। কাছের কোনো বস্তুর দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকলে চোখকে ফোকাস ধরে রাখতে কাজ করতে হয়। ফলে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখ ভারী লাগা বা ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
এর সঙ্গে স্ক্রিনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। চোখের তুলনায় স্ক্রিনের উচ্চতা, স্ক্রিন থেকে দূরত্ব এবং আলো-ছায়ার ভারসাম্য ঠিক না থাকলেও চোখে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
যারা নিয়মিত চশমা ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে চোখের অস্বস্তির আরেকটি কারণ হতে পারে ভুল বা পুরোনো পাওয়ার। সময়ের সঙ্গে চোখের দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন হলে আগের পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখার কারণে চোখে অতিরিক্ত চাপ অনুভূত হতে পারে।
তাই স্ক্রিন দেখার পর চোখে অস্বস্তি হলেই সেটিকে নীল আলোর ক্ষতিকর প্রভাব হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। চোখের পাওয়ার, স্ক্রিনের দূরত্ব, বসার ভঙ্গি এবং চোখের শুষ্কতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ব্লু-লাইট চশমা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ঘুমের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্ধ্যা বা রাতের সময়ে নীল আলোর সংস্পর্শ শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ চক্রে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
মানুষের ঘুমের সঙ্গে মেলাটোনিন নামের হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। রাতে অতিরিক্ত আলো, বিশেষ করে স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো, মেলাটোনিন নিঃসরণে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হওয়া বা ঘুমের স্বাভাবিক সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এই কারণে রাতে স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীল আলো কমানোর কিছু যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঘুমের সমস্যা সমাধানে সবার জন্য ব্লু-লাইট চশমা অপরিহার্য।
ঘুমানোর আগে ফোন বা কম্পিউটারের উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেওয়া এবং সম্ভব হলে ঘুমের কিছু সময় আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করাও কার্যকর অভ্যাস হতে পারে।
ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের সময় চোখের ওপর চাপ কমানোর জন্য বহুল আলোচিত একটি পদ্ধতি হলো ২০-২০-২০ নিয়ম।
এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন দেখার পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকাতে বলা হয়। এতে চোখকে দীর্ঘ সময় একই দূরত্বে ফোকাস করে রাখার চাপ থেকে বিরতি দেওয়া যায়।
একটানা কাজের পরিবর্তে মাঝেমধ্যে চোখকে বিশ্রাম দেওয়ার অভ্যাসও উপকারী।
স্ক্রিন ব্যবহারের সময় চোখের পলক কমে যাওয়া একটি সাধারণ বিষয়। তাই দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের সময় সচেতনভাবে সম্পূর্ণ পলক ফেলার অভ্যাস করা যেতে পারে।
চোখে শুষ্কতা বা অস্বস্তি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলে নিজে থেকে কোনো ধরনের চিকিৎসা শুরু না করে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চোখের আরাম বজায় রাখতে স্ক্রিনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। খুব কাছে থেকে স্ক্রিন দেখা এড়িয়ে চলা, স্ক্রিনের উচ্চতা ও বসার অবস্থান যথাযথ রাখা এবং ঘরের আলো এমনভাবে রাখা দরকার যাতে স্ক্রিনে অতিরিক্ত ঝলক বা প্রতিফলন না পড়ে।
একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিন ব্যবহারের পরিবর্তে নিয়মিত বিরতি নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্লু-লাইট চশমা সাধারণভাবে বিপজ্জনক নয়। কেউ চাইলে ব্যবহার করতেই পারেন। তবে চোখের ক্লান্তি বা স্ক্রিন ব্যবহারের অস্বস্তি কমানোর ক্ষেত্রে এগুলোকে একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই।
স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখে সমস্যা হলে প্রথমে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চোখ শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে কি না, দীর্ঘ সময় বিরতি ছাড়া স্ক্রিন দেখা হচ্ছে কি না, স্ক্রিনের দূরত্ব ও উচ্চতা ঠিক আছে কি না কিংবা চশমার পাওয়ার পরিবর্তন হয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
বিশেষ করে চোখে নিয়মিত ব্যথা, ঝাপসা দেখা, অতিরিক্ত শুষ্কতা, আলো সহ্য করতে সমস্যা বা দৃষ্টির পরিবর্তন দেখা দিলে শুধু ব্লু-লাইট চশমার ওপর নির্ভর না করে চোখের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
ডিজিটাল ডিভাইস আধুনিক জীবনের অংশ হয়ে যাওয়ায় সম্পূর্ণভাবে স্ক্রিন এড়িয়ে চলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সঠিক অভ্যাস তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত বিরতি নেওয়া, পর্যাপ্ত পলক ফেলা, স্ক্রিনের অবস্থান ঠিক রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী চশমার পাওয়ার পরীক্ষা করা এবং রাতে ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার সীমিত করা—এসব অভ্যাস চোখের অস্বস্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ব্লু-লাইট চশমা ব্যবহার করতে চাইলে তা করা যেতে পারে। তবে চশমাটিকে চোখের সব ধরনের সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার পরিবর্তে স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য কারণগুলোর দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
Web: bdkhabor.com. call : +8801823218888. Email: infobdkhabar@gmail.com
▶️ youtube.com/@bdkhabortv 📸 instagram.com/bdkhabar 📘 facebook.com/bdkhabor1 🐦 x.com/b_khabor 🎵 tiktok.com/@sagarbd_official