
দেশে নারীদের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে চিকিৎসকদের বছরে অন্তত একবার নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, রোগটির লক্ষণ, ঝুঁকি, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে নারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। আক্রান্ত নারীদের প্রায় ৬৩ শতাংশই রোগটি সম্পর্কে দেরিতে জানতে পারেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা মাস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা জরুরি
সেমিনারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে নারীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমাদের সর্বনাশ করে ফেলছি। নারীরা এর বেশি শিকার হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, স্তন ক্যান্সার নিয়ে সমাজে সচেতনতার অভাব, রোগের লক্ষণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করার কারণে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। অনেক নারী সামাজিক সংকোচ, লজ্জা কিংবা ভয়ের কারণে প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে চান না। এ ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতে, স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সঠিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে রোগটি নিয়ে অযথা ভয় ও ভুল ধারণা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার প্রবণতাও বাড়বে।
চিকিৎসকদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সচেতনতা তৈরির আহ্বান
স্তন ক্যান্সার মোকাবিলায় চিকিৎসকদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি চিকিৎসকদের বছরে অন্তত একবার নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে নারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং রোগটি সম্পর্কে সচেতন করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের নারীদের কাছেও স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। এ জন্য চিকিৎসকদের নিজ নিজ এলাকায় সচেতনতামূলক সভা, আলোচনা ও প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
বিশেষ করে যেসব নারী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর সুযোগ পান না, তাঁদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হলে নারীরা রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত হবেন।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণে গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. জিয়া উদ্দিন হায়দার বলেন, স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ বাড়ে। এ জন্য নারীদের প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং বা রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি জানান, প্রয়োজনে দেশের স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন কর্মস্থলে স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে নারীদের মধ্যে রোগ শনাক্তকরণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলকে সচেতনতা কার্যক্রমের আওতায় আনা হলে অনেক নারীর কাছে সহজে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছানো যাবে। একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে তাঁদের উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।
তবে স্ক্রিনিং কার্যক্রম সফল করতে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং রোগ শনাক্ত হওয়ার পর পরবর্তী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন
স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রোগটির সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা রাখা। স্তনে নতুন কোনো চাকা বা পিণ্ড অনুভব করা, স্তনের আকার বা আকৃতিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ত্বকে টান বা গর্তের মতো পরিবর্তন, নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া কিংবা নিপল থেকে অস্বাভাবিক স্রাব বের হওয়া—এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে ক্যান্সার হয়েছে, তা নয়। বিভিন্ন নিরীহ সমস্যার কারণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
এ ছাড়া স্তনে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন না থাকলেও বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করানো যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
সামাজিক সংকোচ দূর করে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ
বাংলাদেশে স্তন ক্যান্সার নিয়ে সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণা দূর করা সচেতনতা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। অনেক নারী ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে স্তনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কথা পরিবারের সদস্যদের জানান না। কেউ কেউ চিকিৎসকের কাছে যেতেও দেরি করেন। এর ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু হতে বিলম্ব হতে পারে।
এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদেরও নারীদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনো নারী স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা অন্য কোনো লক্ষণের কথা জানালে তাঁকে নিরুৎসাহিত না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা, নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য প্রচার এবং সহজে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ব্যবস্থা নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
সেমিনারে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং নারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আলোচনায় উঠে আসে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক নারী স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির মুখে থাকায় বিষয়টিকে শুধু চিকিৎসাসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জনস্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শহর ও গ্রামের নারীদের জন্য তথ্যপ্রাপ্তি, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো গেলে রোগটি মোকাবিলায় কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আহ্বান এবং সেমিনারে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর মূল লক্ষ্য হলো নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব কমানো এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
সচেতনতাই পারে ঝুঁকি মোকাবিলার পথ সহজ করতে। স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো প্রত্যেক নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
Web: bdkhabor.com. call : +8801823218888. Email: infobdkhabar@gmail.com
▶️ youtube.com/@bdkhabortv 📸 instagram.com/bdkhabar 📘 facebook.com/bdkhabor1 🐦 x.com/b_khabor 🎵 tiktok.com/@sagarbd_official