
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের জুমার নামাজ আদায়ের জন্য মুসল্লিরা মসজিদে সমবেত হন, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনেন এবং জামাতে নামাজ আদায় করেন। জুমার নামাজের আগে ইমাম সাধারণত দুটি খুতবা প্রদান করেন। প্রথম খুতবার পর ইমাম অল্প সময়ের জন্য বসেন এবং এরপর দ্বিতীয় খুতবা দেন। এই দুই খুতবার মধ্যবর্তী সময়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যায় কি না, কী দোয়া পড়া যায় এবং এ সময় কী করণীয়—এসব বিষয়ে অনেক মুসল্লির মধ্যে আগ্রহ রয়েছে।
ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী, দুই খুতবার মাঝখানে ইমাম বসে থাকার সময় মুসল্লিরা নীরবে আল্লাহর কাছে নিজেদের প্রয়োজন, ক্ষমা, হেদায়েত, সুস্থতা ও কল্যাণের জন্য দোয়া করতে পারেন। তবে এই সময়ের জন্য বিশেষ কোনো দোয়া নির্ধারিত রয়েছে কিংবা একটি নির্দিষ্ট দোয়াই পড়তে হবে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। একইভাবে, দুই খুতবার মাঝখানের সময়টিকে দোয়া কবুলের বিশেষভাবে প্রমাণিত সময় বলে প্রচার করার ক্ষেত্রেও নির্ভরযোগ্য দলিলের প্রয়োজন রয়েছে।
দুই খুতবার মাঝখানে দোয়া করার নিয়ম
জুমার নামাজে ইমাম প্রথম খুতবা দেওয়ার পর বসেন এবং পরে দ্বিতীয় খুতবা শুরু করেন। এ সময় মুসল্লিদের উচিত শান্ত ও সংযত থাকা। কেউ চাইলে মনে মনে অথবা নিচু স্বরে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন। তবে মসজিদে উচ্চস্বরে সম্মিলিত দোয়া, নির্দিষ্ট বাক্য সবাইকে একসঙ্গে পড়তে বলা কিংবা এটিকে বাধ্যতামূলক আমল হিসেবে প্রচার করার আগে নির্ভরযোগ্য ইসলামি দলিল যাচাই করা জরুরি।
খুতবা চলাকালে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা জুমার গুরুত্বপূর্ণ আদব। তাই প্রথম খুতবার পর ইমাম বসার সময়টুকুতে সংক্ষিপ্ত দোয়া করে দ্বিতীয় খুতবা শুরু হলে আবার মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা উচিত।
দুই খুতবার মাঝখানে পড়ার মতো কয়েকটি দোয়া
নিচের দোয়াগুলো কোরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত সাধারণ দোয়া। এগুলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত, কল্যাণ ও হেদায়েত চাওয়ার জন্য পড়া যায়। তবে এগুলোকে দুই খুতবার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত দোয়া মনে করা যাবে না।
১. ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া
আরবি:
رَبِّ اغْفِرْ لِي
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বিগফির লি।
অর্থ:
হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন।
মানুষের জীবনে ভুল ও পাপ হতে পারে। তাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। এই সংক্ষিপ্ত দোয়াটি মুসল্লিরা নীরবে পড়তে পারেন।
২. দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দোয়া
আরবি:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাও, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও, ওয়া কিনা আজাবান নার।
অর্থ:
হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।
এটি পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতের দোয়া। এতে দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণ কামনা করা হয়েছে।
৩. হেদায়েত ও রহমতের দোয়া
আরবি:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা‘দা ইয হাদাইতানা, ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।
অর্থ:
হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদের হেদায়েত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে সত্য থেকে বিচ্যুত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।
এটি সূরা আলে ইমরানের ৮ নম্বর আয়াতের দোয়া। ঈমানের ওপর অবিচল থাকা এবং আল্লাহর রহমত লাভের জন্য এ দোয়া পড়া যায়।
৪. দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তার দোয়া
আরবি:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ
বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াহ।
অর্থ:
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা এবং সুস্থতা কামনা করছি।
এটি ক্ষমা, সুস্থতা ও নিরাপদ জীবনের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত দোয়া। দোয়াটি পড়ার পাশাপাশি অসুস্থতা, বিপদ ও সংকট থেকে মুক্তির জন্যও আল্লাহর সাহায্য চাওয়া যায়।
৫. বাবা-মায়ের জন্য দোয়া
আরবি:
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা।
অর্থ:
হে আমার প্রতিপালক, তাঁরা শৈশবে আমাকে যেভাবে লালন-পালন করেছেন, আপনিও তাঁদের প্রতি সেভাবে দয়া করুন।
এটি সূরা আল-ইসরার ২৪ নম্বর আয়াতের অংশ। বাবা-মায়ের জন্য রহমত ও ক্ষমা কামনা করে এ দোয়া পড়া যায়।
৬. দুশ্চিন্তা ও কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার দোয়া
আরবি:
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
বাংলা উচ্চারণ:
হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।
অর্থ:
আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।
এটি আল্লাহর ওপর ভরসা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাক্য। জীবনের সংকট, ভয় ও অনিশ্চয়তার সময় আল্লাহর সাহায্য কামনায় এটি পড়া যায়।
দুই খুতবার মাঝখানে কোন বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি?
জুমার নামাজে অংশগ্রহণের সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা উচিত—
ইমামের প্রথম ও দ্বিতীয় খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
দুই খুতবার মাঝখানে নীরবে ব্যক্তিগত দোয়া করা যেতে পারে।
আরবি জানা না থাকলে আল্লাহর কাছে নিজের ভাষাতেও ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থনা করা যায়।
নির্দিষ্ট কোনো দোয়াকে এই সময়ের জন্য বাধ্যতামূলক মনে করা যাবে না।
উচ্চস্বরে দোয়া বা কথাবার্তা বলে অন্য মুসল্লির মনোযোগ নষ্ট করা উচিত নয়।
দ্বিতীয় খুতবা শুরু হলে আবার মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনতে হবে।
জুমার দিনে দোয়া কবুলের সময় সম্পর্কে কী জানা যায়?
সহিহ হাদিসে জুমার দিনে এমন একটি সময়ের কথা এসেছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এ সময়টি ঠিক কখন, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। অনেক আলেম আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের আগের সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন; আবার খুতবা ও জুমার নামাজের সময় সম্পর্কেও কিছু মত রয়েছে।
তবে দুই খুতবার মাঝখানের সময়টিই নিশ্চিতভাবে দোয়া কবুলের বিশেষ সময়—এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত বলে প্রচার করা উচিত নয়। মুসলমানদের জন্য উত্তম হলো, জুমার দিনের বিভিন্ন সময়ে বেশি বেশি দোয়া, জিকির, দরুদ ও নেক আমল করা এবং আল্লাহর রহমতের আশা রাখা।
উপসংহার
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। দুই খুতবার মাঝখানে ইমাম বসে থাকার সময় মুসল্লিরা নীরবে ক্ষমা, হেদায়েত, সুস্থতা, পরিবার ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য দোয়া করতে পারেন। এ সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়াকে বাধ্যতামূলক মনে না করে কোরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত দোয়াগুলো অর্থ বুঝে পড়া এবং ইমামের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনাই উত্তম।
Web: bdkhabor.com. call : +8801823218888. Email: infobdkhabar@gmail.com
▶️ youtube.com/@bdkhabortv 📸 instagram.com/bdkhabar 📘 facebook.com/bdkhabor1 🐦 x.com/b_khabor 🎵 tiktok.com/@sagarbd_official