![]()
ইসরাইলের টানা সামরিক হামলা, কঠোর অবরোধ এবং বারবার বাস্তুচ্যুতির ফলে গাজা উপত্যকার গবাদিপশু খাত কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এর প্রভাবে টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানির ঈদ উদযাপন থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন গাজার অধিকাংশ মানুষ। একসময় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত কোরবানি এখন গাজার মানুষের জীবনে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, খাদ্য সংকট ও অবরোধের মধ্যে থাকা গাজাবাসীর জন্য ঈদুল আজহার আনন্দ এখন শুধুই স্মৃতি। যুদ্ধের আগে গাজাজুড়ে কোরবানির ঈদ ঘিরে ছিল ব্যাপক প্রস্তুতি ও উৎসবমুখর পরিবেশ। বিভিন্ন খামারে পশু পালন, বাজারে কেনাবেচা, পরিবারে ঈদের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে ঈদ ছিল মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
গাজা সিটির অন্যতম শীর্ষ গবাদিপশু খামারি মাজেন আল-জেরজাউই বলেন, একসময় ঈদের মৌসুমে তিনি শত শত ভেড়া ও গরু বিক্রির প্রস্তুতি নিতেন। বছরের এই সময়টাতে তার খামারে ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত। কিন্তু বর্তমানে তার কাছে একটি পশুও নেই। যুদ্ধের কারণে খামার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন বাধ্য হয়ে একটি ছোট রেস্তোরাঁ পরিচালনা করছেন। সেখানে উপত্যকায় সীমিত পরিসরে প্রবেশ করা হিমায়িত মাংসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে মাজেন বলেন, “আগে আমি এই সময়ে প্রায় ২০০টি গরু ও ভেড়া বিক্রি করতাম। অথচ এখন একটি পশুও নেই। ইসরাইল গাজায় কোনো জীবন্ত পশু প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তারা গাজার মানুষকে এমনভাবে দেখছে যেন তারা এখানে সাময়িকভাবে বসবাস করছে, আর জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য যতটুকু প্রয়োজন কেবল ততটুকুই দেওয়া হচ্ছে।”
যুদ্ধের আগে প্রতি বছর গাজার বাজারে কোরবানির চাহিদা পূরণে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। কিন্তু টানা আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ এবং অবরোধের কারণে সেই চেনা দৃশ্য আর ফিরছে না।
গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলা, পশুখাদ্য সরবরাহ বন্ধ এবং কৃষি সরঞ্জামের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি গবাদিপশু খাত ধ্বংস হয়ে গেছে।
গবাদিপশুর ভয়াবহ সংকটের কারণে বাজারে পশুর দামও আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের আগে একটি ভেড়ার দাম ছিল প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মার্কিন ডলার। বর্তমানে একই ধরনের একটি ভেড়া কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ডলার বা প্রায় ২০ হাজার ইসরাইলি শেকেল, যা সাধারণ মানুষের নাগালের অনেক বাইরে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে মাজেন আল-জেরজাউই প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন কোরবানির অর্থ দিয়ে হিমায়িত মাংস কিনে পরিবারগুলোকে সহায়তা করেন অথবা অন্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সহযোগিতা করেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য বলছে, যুদ্ধের শুরুতেই গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে। শুধু পশু নয়, ধ্বংস করা হয়েছে খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম এবং পশুচিকিৎসা কেন্দ্রও।
স্থানীয় খামারিরা জানান, বোমাবর্ষণে অসংখ্য পশু মারা যাওয়ার পাশাপাশি বারবার এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে জীবিত পশুগুলো সংরক্ষণ করাও সম্ভব হয়নি। বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় অনেকেই বাধ্য হয়ে অতি কম দামে বা সামান্য খাদ্যের বিনিময়ে নিজেদের পশু বিক্রি করে দিয়েছেন।
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে গাজায় প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৩ হাজারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে গরু ও বাছুর প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যে অল্প কিছু পশু রয়েছে, সেগুলো যাযাবর রাখালদের কাছে রয়েছে এবং সেগুলো বিক্রির জন্য নয়।
তিনি আরও বলেন, পানি তোলার পাম্প ও কূপগুলো অচল হয়ে যাওয়ায় এই খাত পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনাও প্রায় নেই।
এদিকে কোরবানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি শুধু খাদ্য বা অর্থনীতির সংকট নয়, এটি গাজার সামাজিক ও মানসিক জীবনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। গাজা সিটির স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, “টানা তিন বছর আমরা কোনো ঈদ উদযাপন করতে পারিনি। কোরবানির আনন্দ, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মাংস ভাগাভাগি এবং সামাজিক বন্ধনের যে অনুভূতি ছিল, তা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।”
তিনি জানান, গাজার অধিকাংশ পরিবারের এখন তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক মানুষ এক বছরের বেশি সময় ধরে মাংসের স্বাদ পাননি।
জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসির মূল্যায়নে দেখা গেছে, গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর কঠোর ও অনিয়মিত বিধিনিষেধের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গবাদিপশু খাতের এই ধ্বংস শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবকে থামিয়ে দেয়নি; বরং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পশুচিকিৎসক, খামারি, কসাই, পরিবহন শ্রমিক ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ পুরো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাজাকে স্বনির্ভরতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখে পরনির্ভরশীল করে তুলতেই ইচ্ছাকৃতভাবে এই অবরোধ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই
Web: bdkhabor.com. call : +8801823218888. Email: infobdkhabar@gmail.com
▶️ youtube.com/@bdkhabortv 📸 instagram.com/bdkhabar 📘 facebook.com/bdkhabor1 🐦 x.com/b_khabor 🎵 tiktok.com/@sagarbd_official