
কলা পুষ্টিকর ও সহজলভ্য একটি ফল। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অনেকেই কলা রাখেন। এতে কার্বোহাইড্রেট, ফাইবারসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে বাজার থেকে কলা কেনার সময় অনেকেরই প্রশ্ন থাকে—এই কলা কি স্বাভাবিকভাবে পেকেছে, নাকি কৃত্রিম কোনো উপায়ে পাকানো হয়েছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই কৃত্রিমভাবে পাকানো ফল নিয়ে নানা ধরনের সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে কলার ক্ষেত্রে খোসার রং, গন্ধ কিংবা শক্তভাব দেখে রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়েছে কি না বোঝার বিভিন্ন দাবি করা হয়। কিন্তু বাস্তবে শুধু একটি লক্ষণ দেখে কলার পাকানোর পদ্ধতি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
শুধু হলুদ রং দেখেই সিদ্ধান্ত নয়
কলার খোসার রং হলুদ হলেই সেটিকে কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। প্রাকৃতিকভাবে পাকানো কলার রংও সবসময় একই রকম হয় না। সংরক্ষণ, পরিবহন, তাপমাত্রা এবং কলার জাতের পার্থক্যের কারণে খোসার রঙে কিছুটা তারতম্য দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু কলার খোসা বেশি হলুদ, কম হলুদ কিংবা কোথাও একটু দাগযুক্ত—এমন কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে কলাকে ‘রাসায়নিক দিয়ে পাকানো’ বলে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।
কলা সাধারণত কীভাবে পাকানো হয়?
বাজারে বিক্রির জন্য কলা অনেক সময় পুরোপুরি পাকার আগেই গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এর অন্যতম কারণ হলো পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় ফল যাতে নষ্ট না হয়। পরে উপযুক্ত পরিবেশে কলাকে পাকানো হয়।
ফল পাকানোর ক্ষেত্রে ইথিলিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফল নিজেও স্বাভাবিকভাবে ইথিলিন তৈরি করে এবং এই হরমোন পাকানোর প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বাইরে থেকে ইথিলিন ব্যবহার করেও পাকানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা যায়।
অর্থাৎ বাইরে থেকে ইথিলিন প্রয়োগ করা মানেই ফল বিষাক্ত বা অনিরাপদ—এমনটি বলা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকানোর জন্য অনুমোদিত পদ্ধতি ও নিরাপদ মাত্রা অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
ক্যালশিয়াম কার্বাইড নিয়ে কেন সতর্কতা?
কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোর আলোচনায় ক্যালশিয়াম কার্বাইড-এর নাম প্রায়ই সামনে আসে। এটি ফল পাকাতে ব্যবহার করা নিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ রয়েছে এবং অনেক জায়গায় এর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
তাই ফল পাকানোর ক্ষেত্রে অনুমোদিত ও নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ফল নিষিদ্ধ রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়েছে বলে সন্দেহ হলে সেটি না কেনাই নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
কলা কেনার সময় কী কী দেখবেন?
কলা কেনার সময় কয়েকটি সাধারণ বিষয় লক্ষ্য করা যেতে পারে। তবে এগুলোকে কোনো রাসায়নিক পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
১. স্বাভাবিক গন্ধ আছে কি না দেখুন
পাকা কলায় সাধারণত স্বাভাবিক মিষ্টি ও ফলের গন্ধ থাকে। অস্বাভাবিক বা রাসায়নিকের মতো গন্ধ পাওয়া গেলে সেই কলা না কেনাই ভালো।
২. অতিরিক্ত উজ্জ্বল রং নিয়ে সতর্ক থাকুন
শুধু উজ্জ্বল হলুদ রং দেখেই কলাকে কৃত্রিমভাবে পাকানো বলা যাবে না। তবে অস্বাভাবিক চেহারা, গন্ধ ও গঠনের মতো একাধিক বিষয় একসঙ্গে অস্বাভাবিক মনে হলে সতর্ক হওয়া উচিত।
৩. খোসার পাশাপাশি ভেতরের গঠনও বিবেচনা করুন
বাইরে দেখতে পাকা হলেও কলা যদি অস্বাভাবিকভাবে শক্ত থাকে, অথবা পাকাভাবের সঙ্গে ভেতরের গঠন সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সেটি না খাওয়াই ভালো।
৪. রাসায়নিকের মতো গন্ধ পেলে কিনবেন না
ফল থেকে স্বাভাবিক ফলের গন্ধের পরিবর্তে তীব্র বা অস্বাভাবিক গন্ধ পাওয়া গেলে সেটি এড়িয়ে চলুন।
৫. বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে কিনুন
পরিচিত ও বিশ্বস্ত বিক্রেতা বা নির্ভরযোগ্য বাজার থেকে ফল কেনার চেষ্টা করুন। ফলের উৎস ও সংরক্ষণ সম্পর্কে যতটা সম্ভব নিশ্চিত হওয়া ভালো।
৬. অতিরিক্ত পাকা বা নষ্ট কলা এড়িয়ে চলুন
বাড়িতে আনার পর কোনো কলায় অতিরিক্ত পচন, ছত্রাক, অস্বাভাবিক গন্ধ বা নষ্ট হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে সেটি না খাওয়াই উচিত।
৭. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিন
খাওয়ার আগে কলার বাইরের অংশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নেওয়া ভালো। বিশেষ করে হাত পরিষ্কার করে ফল খাওয়ার অভ্যাসও জরুরি।
‘রাসায়নিকমুক্ত’ কথাটিও বুঝে বলা দরকার
ফল নিয়ে আলোচনায় অনেক সময় ‘রাসায়নিকমুক্ত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে ফলের নিজস্ব জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়াও রয়েছে। তাই কোনো ফল ‘রাসায়নিক আছে’ বলেই সেটিকে ক্ষতিকর মনে করা ঠিক নয়।
আসল বিষয় হলো—ফল উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পাকানোর ক্ষেত্রে অনুমোদিত পদ্ধতি ও খাদ্যনিরাপত্তার নিয়ম মানা হয়েছে কি না।
কলা কি তাহলে খাওয়া বন্ধ করতে হবে?
না। শুধু কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোর আশঙ্কার কারণে কলা খাওয়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং নিরাপদ উৎস থেকে তাজা ও ভালো মানের ফল কেনা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং নষ্ট বা অস্বাভাবিক ফল এড়িয়ে চলাই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো ছবি বা ‘একটি লক্ষণ দেখেই রাসায়নিক দিয়ে পাকানো ফল চেনার উপায়’ ধরনের দাবিকে যাচাই না করে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
সচেতনতাই খাদ্যনিরাপত্তার প্রথম ধাপ
কলা পুষ্টিকর একটি ফল হলেও কেনার সময় সচেতন থাকা জরুরি। তবে খোসার রং বা একটি মাত্র বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ফলের পাকানোর পদ্ধতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অস্বাভাবিক গন্ধ, চেহারা, গঠন বা পচনের লক্ষণ থাকলে ফলটি এড়িয়ে চলা এবং বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে ফল কেনাই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অভ্যাস।
ভোক্তাদের পাশাপাশি ফল ব্যবসায়ীদেরও খাদ্যনিরাপত্তার নিয়ম মেনে ফল সংরক্ষণ ও পাকানো নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সচেতন ক্রেতা, দায়িত্বশীল বিক্রেতা এবং যথাযথ তদারকি—তিনটিরই প্রয়োজন রয়েছে।
Web: bdkhabor.com. call : +8801823218888. Email: infobdkhabar@gmail.com
▶️ youtube.com/@bdkhabortv 📸 instagram.com/bdkhabar 📘 facebook.com/bdkhabor1 🐦 x.com/b_khabor 🎵 tiktok.com/@sagarbd_official